কিশোরদের হাতে থাকার কথা বই, চোখে থাকার কথা স্বপ্ন, আর মনে থাকার কথা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়। অথচ সেই বয়সের কেউ কেউ যখন দলবদ্ধ হামলা, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রশ্ন হয়ে থাকে না; সামনে আসে পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের দায়িত্বহীনতার কঠিন বাস্তবতা। কিশোরদের মব সন্ত্রাস তাই কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় নয়।
দলবদ্ধ উন্মত্ততার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এখানে অনেক সময় ব্যক্তির বিবেক চাপা পড়ে যায় গোষ্ঠীর শক্তি প্রদর্শনের কাছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই কাউকে আক্রমণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবে উত্তেজিত হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে সংঘবদ্ধ সহিংসতায় রূপ দেওয়া—এসব প্রবণতা নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি। কোনো অভিযোগই কাউকে নিজের হাতে বিচার করার অধিকার দেয় না। অপরাধের বিচার হবে আইন অনুযায়ী, কোনো উত্তেজিত জনতার ইচ্ছায় নয়।
কিশোরদের এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব, মাদকের ঝুঁকি, সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারের মতো নানা কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের বাস্তবতা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। কোনো একটি কারণকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একইভাবে, কয়েকজনের অপরাধের জন্য পুরো কিশোরসমাজকে দায়ী করাও অনুচিত।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, আক্রমণাত্মক মনোভাব কিংবা অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার লক্ষণ দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শাসন ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, নৈতিক শিক্ষা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার্থীদের আচরণ, মানসিক সুস্থতা, সহমর্মিতা ও বিরোধ নিষ্পত্তির শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিশোরদের সংঘবদ্ধ সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অপরাধীর পরিচয়, বয়স কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক যেন বিচারের পথে বাধা না হয়। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও অধিকার রক্ষা করতে হবে। অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও রাখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি কিংবা সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে অপরাধকে গৌরবান্বিত করার প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে। কোনো ঘটনা যাচাই না করে প্রচার করা কিংবা কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা নতুন সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। এ বিষয়ে গণমাধ্যম, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তবে কেবল গ্রেপ্তার কিংবা শাস্তি দিয়ে কিশোর অপরাধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাভ্যাস, কারিগরি শিক্ষা ও সৃজনশীল উদ্যোগে কিশোরদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ এবং ইতিবাচক বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে কোনো সংগঠিত চক্র, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকা থাকলে তা-ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
আমরা মনে করি, কিশোরদের মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে একদিকে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, অন্যদিকে কিশোরদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দায়িত্বশীল ও মানবিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, আবার সংশোধনের সম্ভাবনাও নষ্ট করা যাবে না। প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, পারিবারিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা এবং সামাজিক প্রতিরোধ।
আজকের কিশোররাই আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে। তাদের একটি অংশের হাতে যদি সহিংসতা ও উন্মত্ততার চর্চা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে তার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে। তাই এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিশোরদের হাতে অস্ত্র নয়, বই তুলে দিতে হবে; প্রতিশোধের শিক্ষা নয়, সহমর্মিতা শেখাতে হবে; দলবদ্ধ উন্মত্ততা নয়, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।
কিশোরদের মব সন্ত্রাস রুখতে হবে এখনই। কারণ, কিশোরদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানে সমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
