২৪ঘণ্টা অনলাইন: মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণার সন্ধান পেয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রসিভারেন্স রোভার। লাল গ্রহটিতে ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের ক্ষেত্রে এসব ধূলিকণা কেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, রোভারটির নতুন তথ্যে তা উন্মোচিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গল গ্রহে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে সূক্ষ্ম এই কণাগুলোর ব্যাস ১০০ নানামিটারের মতো, যা মানুষের চুলের তুলনায় প্রায় ৫০০ গুণ পাতলা।
বিজ্ঞান সাময়িকী 'প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সাইন্সেস'-এ প্রকাশিত এই গবেষণার প্রধান লেখক এবং সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী স্কট ভ্যানবমেল জানিয়েছেন, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকার মানেই কণাগুলো বেশি বিপজ্জনক, বিষয়টি তেমন নয়। তবে ছোট কণাগুলোর মানবদেহের গভীরে প্রবেশ করার সক্ষমতা বেশি থাকে এবং দেহ থেকে এগুলো বের করাও কঠিন। তিনি উল্লেখ করেন, যেকোনো পদার্থের বিষাক্ততা মূলত নির্ভর করে মানবদেহ কতটা গ্রহণ করছে এবং কত সময় ধরে সেটির সংস্পর্শে থাকছে তার ওপর। মঙ্গলের ধূলিকণায় সিলিকা, আয়রন যৌগ এবং পারক্লোরেটের মতো ক্লোরিন যৌগ রয়েছে, যা পৃথিবীতে উচ্চ মাত্রায় ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত।
২০২১ সালে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের জেজেরো ক্রেটারে অবতরণের পর থেকে রোভারটি নিয়মিত অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে লাল গ্রহের ধূলিকণার ব্যাস প্রায় ৩ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে প্রসিভারেন্স রোভারে থাকা এক্স-রে লিথোকেমিস্ট্রি ভিত্তিক প্ল্যানেটারি ইনস্ট্রুমেন্ট বা 'পিক্সেল' যন্ত্রটি তার চেয়েও ক্ষুদ্র দুই ধরনের ধূলিকণার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে। অতিসূক্ষ্ম কণার পাশাপাশি ২.৫ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট সূক্ষ্ম কণাও সেখানে পাওয়া গেছে, যা মানুষের চুলের চেয়ে ৩০ গুণ পাতলা।
গবেষকদের আশঙ্কা, এসব ধূলিকণা নভোচারীদের ফুসফুসে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া সেখানকার পরিবেশ ও ধূলিকণার ভৌত বৈশিষ্ট্যের কারণে সময়ের সাথে সাথে স্পেসস্যুট এবং বাসস্থানের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই বিষয়টি পরীক্ষার জন্য প্রসিভারেন্স রোভারটি তার সাথে বিভিন্ন উপকরণের নমুনা বহন করছে। এর মধ্যে কৃত্রিম তন্তু 'ভেকট্রান' এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রলেপ 'টেফলন'-এর চারকোণা নমুনা তলে ধূলিকণার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিজ্ঞানী স্কট ভ্যানবমেল বলেন, তাদের কাছে এখনো এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ধূলিকণা স্পেসস্যুটের উপকরণগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তবে তন্তুগুলোর সাথে ধূলিকণার মিথস্ক্রিয়া ভিন্নভাবে হতে দেখা গেছে। ভেকট্রান তন্তুর বুননের নিচের অংশে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ধূলিকণা বেশি আটকে থাকে। অন্যদিকে টেফলনে কম ধূলিকণা জমা হলেও যেগুলো আটকে ছিল তা ছিল অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম। এটি ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে ঘটে থাকে, যা আলাদা আকারের কণাকে পদার্থের সাথে ভিন্নভাবে যুক্ত হতে বাধ্য করে।
২০৩০-এর দশকেই মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নাসা। গবেষকরা মনে করছেন, এসব তথ্য ভবিষ্যতের মানববাহী মঙ্গল অভিযানের ক্রু সাপোর্ট সিস্টেম ডিজাইন করতে সাহায্য করবে। এর মধ্যে স্পেসস্যুট ও বাসস্থানের উপাদানের সঠিক নির্বাচন এবং সাব-মাইক্রন আকারের ধূলিকণা পরিষ্কার করার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। এটি বিষাক্ততার ঝুঁকি সংক্রান্ত নাসা নির্দেশিকা ও প্রোটোকলকেও সমৃদ্ধ করবে। ভ্যানবমেল জানান, বাসস্থানে কী পরিমাণ ধুলা পৌঁছাবে তা মূলত স্স্যুট এবং এয়ারলকের নকশার ওপর নির্ভর করবে। এ উদ্দেশ্যে নাসা বর্তমানে 'স্যুটপোর্ট' (স্পেসস্যুটের ডকিং স্টেশন) এবং দুই কক্ষ বিশিষ্ট এয়ারলকসহ বিভিন্ন ধারণা নিয়ে কাজ করছে যেন মূল থাকার জায়গায় ধুলা ঢুকতে না পারে।
চাঁদে চাঁদের ধূলিকণার প্রভাব নিয়ে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো মিশনগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে নাসার। চাঁদের ধুলা নভোচারীদের স্পেসস্যুটের বাইরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, সিল নষ্ট করেছিল এবং চোখের সুরক্ষামূলক ভিজরে স্ক্র্যাচ ফেলেছিল। এছাড়া কোনো কোনো নভোচারীর মধ্যে অ্যালার্জির মতো উপসর্গ দেখা গিয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের ধূলিকণা এবং মঙ্গলের ধূলিকণার ধরন পুরোপুরি আলাদা। যদিও প্রসিভারেন্স রোভারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল প্রাচীন অণুজীব জীবনের চিহ্ন খোঁজা, তবুও নাসা এটিকে মানব অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবেও ব্যবহার করছে। বিজ্ঞানী ভ্যানবমেল বলেন, এই ফলাফলের মানে এমন নয় যে মঙ্গল মানবজাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সূত্র: সিএনএ
