২৪ঘন্টা অনলাইন: ২৪ঘন্টা অনলাইন : পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন এবং জ্বালানি খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়—এমন প্রকল্প থেকে সরে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাস ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনে ‘সায়েন্স পলিসি ডায়ালগ অন ব্ল্যাক কার্বন অ্যান্ড আদার শর্ট-লিভড ক্লাইমেট পলিউট্যান্টস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, অতীতে মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের নামে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো অবস্থাতেই উন্নয়নের স্বার্থে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়।
নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও বৃক্ষরোপণে বড় লক্ষ্য
সরকারের পরিবেশবিষয়ক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কমানো এবং পানিসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে বাড়বে সৌরশক্তির ব্যবহার
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবনে সৌরশক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ জন্য বিশেষ নীতিসহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের পাশাপাশি গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি ও লিড সার্টিফিকেশনের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন মাহদী আমিন। একই সঙ্গে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানির কার্যকর ব্যবহারের কথা জানান তিনি।
জলবায়ু অর্থায়নে উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় তুলনামূলক কম হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকি অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
এ পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে এ বিষয়ে কাজ করছে সরকার বলেও জানান তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় অতীতের উদ্যোগের প্রসঙ্গ
পরিবেশ রক্ষায় অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সিএনজিচালিত যানবাহন চালু, ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃক্ষমেলা ও সামাজিক বনায়নের কার্যক্রমও আরও বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের অংশগ্রহণের আহ্বান
পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, গবেষণা ও নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
সেমিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আব্দুস সালাম। সঞ্চালনা করেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওরজান গুসটাফসোন।
