মুবতাসিন ইফতেখার হাসান সপ্তক : ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩। প্রকৃতি তখন রুদ্ররূপে। বৈশাখ শুরু হলেও বৃষ্টির দেখা নেই। চারপাশ জুড়ে প্রচণ্ড দাবদাহে নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা। এমনই এক দিনে বিশুদ্ধ যোগ কালচারের আনন্দ আয়োজন যেন ভিন্ন এক প্রশান্তির বার্তা নিয়ে এলো।
সকালের শুরুটা ছিল বেশ তাড়াতাড়ি। গন্তব্য ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত রূপগাঁও রিসোর্ট। শহরের কোলাহল আর ব্যস্ততা পেরিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় এক নির্মল, সবুজ আর প্রশান্ত পরিবেশে। যেখানে প্রকৃতি যেন নিজেই আয়োজন করে রেখেছে এক অনন্য উৎসবের।
উৎসবের সকালটা ছিল ভিন্নমাত্রায় ভরা। বর্ষবরণের রেশ কাটেনি। চারপাশে উৎসবের রঙ, মনজুড়ে এক অনাবিল উচ্ছ্বাস। শহুরে জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে প্রকৃতির কোলে ছুটে যাওয়ার এই দিনটি হয়ে উঠেছিল সত্যিই বিশেষ এক উপলক্ষ।

রূপগাঁও রিসোর্টে পৌঁছেই যেন আয়োজনের সঙ্গী ১৭ জন প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলেন। চারপাশে সবুজের সমারোহ, শান্ত পরিবেশ, স্নিগ্ধ বাতাস—সব মিলিয়ে এক প্রশান্তির আবহ। এখানে শুধু ঘুরে বেড়ানোই নয়, ছিল গ্রামীণ শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে নিজেকে ভরিয়ে নেওয়া সুযোগ। খাওয়া-দাওয়াতেও ছিল খাঁটি বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। বিনোদনের পাশাপাশি মন ও শরীরকে সতেজ করে তোলার এক অপূর্ব আয়োজন।
নির্ধারিত স্থান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা শুরু করে বিশুদ্ধ যোগ কালচারের একদল সদস্য। মিনি বাসে গান, হাসি আর আনন্দ উদ্বেলিত সেই যাত্রা এক ঘণ্টা না পেরুতেই পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। রিসোর্টে ঢুকেই মন জুড়িয়ে যায় সবার। বাঁশ, কাঠ আর মাটির সমন্বয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন দোতলা স্থাপনা। উপরে কয়েকটি ঘর, নিচে বড় বৈঠকখানা, খাবার ঘর, রান্নাঘর ও প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা।
চারপাশে আম, জাম, কাঁঠালসহ নানা গাছের সমাহার। আঙিনায় শুকনো ধানের আঁটি, পাশে সবজি বাগান, আর একটু সামনে শান্ত, স্থির এক গ্রাম্য পুকুর। ঢাকার এত কাছে এমন নিখাদ গ্রামীণ পরিবেশ যেন কল্পনাকেও হার মানায়। তাই সবার ভালো লাগাটাও ছিল অভাবিত।
রিসোর্টে পৌঁছেই পরিবেশন করা হলো গরম গরম লাল আটার রুটি, সঙ্গে সবজি ও দেশি মুরগির ডিম। চা পর্বের পর কেক কেটে দেরিতে হলেও বৈশাখ উদযাপন সম্পন্ন হলো। এরপর শুরু হলো চারপাশে ঘুরে বেড়ানো, প্রকৃতি উপভোগ আর ছবি তোলার ব্যস্ততা। কিছুক্ষণ পর সবাই ফিরে এলো বৈঠকখানায়, যেখানে জমে উঠল প্রাণবন্ত আড্ডা।
আড্ডার একপর্বে ছিল পিলো পাসিং গেম, এরপর সংক্ষিপ্ত যোগ প্রতিযোগিতা। ক্লান্তির মাঝেই এসে গেল দুপুরের খাবারের ডাক। লাল চালের ভাত, সবজি, দুই ধরনের ভর্তা, দেশি মুরগি আর আমের ডাল; সব মিলিয়ে এক জম্পেশ ভুরিভোজ। শেষে ছিল দেশি গরুর দুধের পায়েস। খাওয়ার আগে পরিবেশন করা হয়েছিল আখের গুড়ের শরবত।
খাবার শেষে আবার বেরিয়ে পড়া। এবার খুঁজে পাওয়া গেল কাঁঠাল ও বাঁশঝাড়ে ঘেরা এক বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। পায়ের নিচে নরম ঘাস, মাথার ওপর ছায়াঘেরা গাছ, আর বয়ে চলা মৃদুমন্দ বাতাস—সবাইকে যেন এক মোহময় আবেশে জড়িয়ে ফেলেছিল। সেখানে বসেই চলল গল্প-আড্ডা, আর ফিরে যাওয়া শৈশবের স্মৃতির পাতায়।

বিকেলে পরিবেশন করা হলো পেঁয়াজ-ঝাল মাখানো দেশি মুড়ি আর গরুর দুধের চা; যা যোগ করল ভ্রমণের আরেকটি স্বাদ। ফেরার আগে নিজের পছন্দমতো কেউ কিনলেন সবজি, চাল, মুড়ি, দুধ কিংবা তাদের তৈরি আয়ুর্বেদিক পণ্য।
আনন্দ-উৎসবের আয়োজন শেষে ফিরে আসার পালা। সবুজে ঘেরা সেই শান্ত পরিবেশ ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না। তবুও জীবন তো চলমান। এই ছোট্ট ভ্রমণ হয়তো সময়ের হিসাবে খুব দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উপভোগ করার মতো। হাসি, আড্ডা আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কাটানো এই সময় যেন আবার নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করল আমাদের ব্যস্ত এবং বাঁধাধরা যান্ত্রিক জীবনে।
বিশুদ্ধ যোগ কালচারের প্রতিষ্ঠাতা শাহনাজ পারভীন শিখা বলেছেন, ‘এটা ছিল স্রেফ আমাদের আনন্দ ভ্রমণ। আমরা নানা উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। আমার প্রতিষ্ঠানে যারা ইয়োগা করে তাদের একটি অংশ নিয়েই ছিল বৈশাখ উদযাপনের আদলে একদিন প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো পরিকল্পনা। দারুণ একটি দিন কেটেছে আমাদের।’
