২৪ঘণ্টা অনলাইন: দেশের স্বাস্থ্যখাতে এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হলেও অর্থের কার্যকর ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আশঙ্কারও জন্ম দেয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের ৪৬৩টি উপজেলা হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জনবল সংকটে থাকা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালু করা, আটটি ক্যানসার ইনস্টিটিউট, দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১৮টি এক হাজার শয্যার সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতেও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও অনেক সময় তা পুরোপুরি ব্যয় করা যায়নি। ফলে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমানোর ঘটনাও ঘটেছে। তার মতে, স্বাস্থ্যখাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বায়ত্তশাসন দেওয়া গেলে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন গঠন প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির এক শতাংশের বেশি বরাদ্দ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অর্থ ব্যয়ে বিলম্ব হতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়। এ ব্যয় কমাতে আরও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি স্বাস্থ্যখাতের সর্বোচ্চ বাজেট। তবে বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক বাধার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. নাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এবার স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। তিনি জানান, উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সেবার পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহনে হেলিকপ্টার সেবাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী ও সরঞ্জামের ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার
হৃদরোগ চিকিৎসার স্টেন্ট বা হার্টের রিংয়ের ওপর কর কমানো
ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে কর-ভ্যাট ছাড়
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পণ্যে অগ্রিম আয়কর হ্রাস
মরচুয়ারি সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমানো
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দেশীয় ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে নতুন কিছু কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড় এবং রেয়াতি সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদন, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদন এবং ওষুধ রপ্তানি বৃদ্ধিতে এসব উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের মতে, বরাদ্দের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থের সঠিক ব্যবহার ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
