২৪ঘণ্টা অনলাইন: আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন করনীতিকে কেন্দ্র করে দেশের আবাসন খাতে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট) চুক্তির আওতায় জমির বিনিময়ে ফ্ল্যাট, সাইনিং মানি বা অন্য আর্থিক সুবিধা পাওয়া জমির মালিকদের ওপর ‘মূলধনি মুনাফা কর’ (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে জমির মালিকদের কোটি টাকার করের বোঝা বহন করতে হতে পারে এবং আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে নগদ অর্থ, সাইনিং মানি, ফ্ল্যাট, নির্মাণকালীন ভাড়া সুবিধা বা আর্থিক মূল্যসম্পন্ন অন্য কোনো সুবিধা পেলে তা ‘মূলধনি মুনাফা’ হিসেবে বিবেচিত হবে। জমির আদি অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, যৌথ উন্নয়ন পদ্ধতি দেশের নগরায়ণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীর অধিকাংশ আবাসন প্রকল্প এই মডেলের ওপর নির্ভরশীল। নতুন কর আরোপের ফলে জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়েই চুক্তিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, জমির মালিক ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার সময় প্রকৃত অর্থে কোনো নগদ আয় করেন না, বরং একটি সম্পদের মালিক হন। সেই পর্যায়ে বিপুল অঙ্কের কর আরোপ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১২ কোটি টাকা মূল্যমানের ফ্ল্যাট পাওয়ার বিপরীতে কোনো জমির মালিককে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যুক্তি হলো, ফ্ল্যাট বা অন্য সম্পদ পাওয়ার মাধ্যমে জমির মালিক একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেন, যার বাজারমূল্য রয়েছে। ফলে সেটিকে করের আওতায় আনা আইনগতভাবে যৌক্তিক।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিধান কার্যকর হলে জমির মালিকদের করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রে সাইনিং মানি, নির্মাণকালীন ভাড়া এবং ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য মিলিয়ে করযোগ্য মুনাফার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
আবাসন উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন করনীতির কারণে প্রকল্প গ্রহণ কমে গেলে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, লিফট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ আবাসননির্ভর প্রায় ২৬৯টি শিল্প ও সেবাখাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের গতি কমে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মত, ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার সময় নয়, বরং ভবিষ্যতে সেই ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্রকৃত আয় অর্জনের পর মূলধনি মুনাফার ওপর কর আরোপ করা হলে রাজস্বও নিশ্চিত হবে এবং জমির মালিকদের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপও তৈরি হবে না।
১ জুলাই ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমির মালিক, ডেভেলপার এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, করনীতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে দেশের আবাসন খাত দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে পড়তে পারে। তাই প্রস্তাবিত বিধান পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
