সত্তর দিন পেরিয়েও 'প্রত্যাবর্তন' চলছে প্রেক্ষাগৃহে। বর্তমান সমাজের নানা সংকট তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। একসময়ে অফিসের নিচে এক চায়ের দোকানে আড্ডা জমালেন শিলাজিৎ মজুমদার। গান হোক বা অভিনয়, সবেতেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত। নিজের শর্তে বাঁচেন। যেকোনো সৃজনশীল কাজেই তাঁর আগ্রহ। ভালোবাসেন মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত, কিছুটা খামখেয়ালিও। তিনি শিলাজিৎ মজুমদার। 'নীহারিকা', 'অযোগ্য' পেরিয়ে পরিচালক সমর্পণ সেনগুপ্তের 'প্রত্যাবর্তন' ছবিতে তাঁর অভিনয় ফের প্রশংসিত। সত্তর দিন পার করেও প্রেক্ষাগৃহে চলছে ছবিটি। সমাজের নানা সংকট তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। একসময়ের অফিসের নিচে এক চায়ের দোকানে আড্ডা জমালেন শিলাজিৎ।
প্রশ্ন: অভিনেতা শিলাজিতের কি 'প্রত্যাবর্তন' ঘটল?
শিলাজিৎ: আমি যখন প্রথম 'সঙ্গী' করেছিলাম, আমাকে দেখে মানুষ অবাক হয়েছিলেন। যখন 'অসুখ' করেছিলাম, তাতেও বেশ অন্যরকম চরিত্র করেছিলাম। এক দিকে হরনাথ চক্রবর্তী অন্য দিকে ঋতুপর্ণ ঘোষ, শেখর দাসের ছবিও করেছি। একটা করে অভিনয় দেখেছেন আমার, আবার ভুলে গিয়েছেন দর্শক। তবে আমি খুব কমই ছবি করি। কিন্তু আমি খুব ভাগ্যবান, এই যে চরিত্রগুলো আমি করেছি এই ধরনের চরিত্র করতে অভিনেতারা হাত কামড়ান। এই ছবির কথা মানুষ বলছেন, এটাকে যদি প্রত্যাবর্তন বলা হয় তা হলে তা-ই। আবার দুই বছর পরে ছবি করব ভেবেছি।
প্রশ্ন: সত্তর দিন ধরে ছবি চলছে, আশা করেছিলেন?
শিলাজিৎ: দারুণ লাগছে। নতুন প্রযোজনা সংস্থা, নতুন পরিচালক। তাঁদের কাজ প্রশংসিত হচ্ছে, এটা বড় পাওয়া। আমি নন্দনে গিয়েছিলাম হল ভিজিটে, এতটা আশা করিনি আমি। 'প্রত্যাবর্তন' দেখে বেরোনোর পরই প্রতিক্রিয়াটা অন্যরকম।
প্রশ্ন: রাহুলের মৃত্যুর ঘটনায় অভিনেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এই বিষয়গুলো যথাসময়ে বলতে এত সংশয় কোথায় হয়?
শিলাজিৎ: অনেক ছবি করতে গিয়েই দেখেছি, কথা বলতে গিয়ে শুনতে হয়েছে, আমার নাকি খুব অহংকার। নিরাপত্তার মতো সামান্য চাহিদাগুলোও প্রযোজকেরা মনে করেন বিলাসিতা। কিন্তু আমি সিরিয়াসলি বলছি, এই যে রাহুলের ঘটনাটা ঘটল, সে দিন রাহুল যদি ওখানে নিরাপত্তার জন্য কিছু জিনিস চাইত, ও হয়তো পেত না, ওকে দেওয়া হত না বলেই আমার বিশ্বাস।
প্রশ্ন: যদি তিনি নিরাপত্তা ছাড়া ওই দৃশ্য করবেন না বলতেন তা হলে বোধহয় আটকানো যেত?
শিলাজিৎ: আমাদের এখানকার শিল্পীরাও ভীষণ ইন্ডাস্ট্রির প্রতি ডেডিকেটেড এবং নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে ভেবে নেয়, 'ওইটুকু রিস্ক নেওয়াই যায়।' আমি অনেক ছবি না করেছি, আমি না করতে জানি। একবার আমার কোমরে ব্যথা ছিল, আমি তখন 'অযোগ্য' ছবির শুট করছি, ৫-৬ দিনের জন্য কাজ করার কথা ছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, পুলিশ অফিসারের চরিত্র। আমি বললাম, আমার কোমরে ব্যথা আছে। সেই সময়ে বলেছিলাম একজন ডামি দিতে হবে শুধু অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য। কিন্তু সেটুকুও দেওয়া যাবে না বলা হয়েছিল। সামান্য ফিজিওথেরাপিস্টও নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন: কোনো প্রযোজনা সংস্থা, নাকি কোনো পরিচালক?
শিলাজিৎ: নামটা বললে তিনি একটু দুঃখ পাবেন, কান্নাকাটি করবেন আমার কাছে এসে। রাহুলের মৃত্যুর পরে খুব কান্নাকাটি করেছিলেন তিনি। এই যে গায়ক কেকের মৃত্যুর পরে সাংঘাতিক একটা আন্দোলন হল, তার মধ্যে একদল লোক রূপঙ্করকে (বাগচী) অযাচিত ভাবে 'ট্রোল' করল। আসল বিষয়টা থেকেই ফোকাসটা সরে গেল। কেকের মৃত্যুর পরে এই কয়েক বছরে, আমাদের শো চলাকালীন এরকম গরমে কোথাও কোনো সাবধানতা নেওয়া হয় কি, কোথাও ডাক্তার থাকে কি? শিল্পীরা একটা আলাদা ঘর চাইলেই অসুবিধা হয়। এগুলো নিয়ে আর কী বলব?
প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর পরে প্রায় কয়েক মাস হল, এখনও পর্যন্ত কেউ জানে না আসল ঘটনা কী, আপনার কী মনে হয়?
শিলাজিৎ: এটা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল যে, তিনি ওখানে থেকে গিয়েছিলেন। অন্য ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল। আমাকে অনেকে প্রতিক্রিয়া নেওয়ার জন্য ফোন করেছিলেন। তাঁদের আমি বলেছিলাম, আপনাদের প্রথমেই এই কথাটা মনে হচ্ছে কেন? তার মানে, আমি যদি মরে যেতাম, তাহলে আমার ওখানে বডিটা আসত, তখন তো আপনারা প্রথমে এসে আমার মুখ শুঁকতেন (পরীক্ষা করতেন, মদ্যপান করেছি কিনা)। রাহুল বলে ওটা হয়তো হয়নি।
প্রশ্ন: রাজ্যে পালাবদলের পরে কতখানি আশাবাদী আপনি?
শিলাজিৎ: আমি অনেকটাই আশাবাদী। ৩৪ বছর আশা করেছিলাম। ১৫ বছর আশা করেছিলাম। এবার নিশ্চয়ই আশা করার সময়টা কমবে। অনেক কাজ করার আছে এই সরকারের। ওদের কতগুলো জিনিস আমার মনে হচ্ছে ঠিক। এই কয়েক দিনে তো আঁচ করে বলা সম্ভব নয়, কিন্তু কতগুলো মুভমেন্ট দেখে মনে হচ্ছে, যে কাজগুলো ওরা করছে, সেটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে। আমার নিজের ব্যক্তিগত কোনো চাহিদা নেই।
প্রশ্ন: নাগরিক হিসেবে কোন কোন দিকগুলোয় নজর দেওয়া উচিত বলে মনে হয় আপনার?
শিলাজিৎ: পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষের শিক্ষার খুব প্রয়োজন। যে সব মধ্যবিত্ত বাড়ির বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়ের প্রতি নজর রাখতে পারে এবং একটা বেসরকারি স্কুলে দিতে পারে তারা আলাদা। কিন্তু সরকারি স্কুল বা আমার গ্রামের স্কুল দেখে বুঝেছি, অবস্থা খুব খারাপ। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম চাহিদা, গরিবদের দিকে নজর দেওয়া হোক। আর হ্যাঁ, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াটাও সাংঘাতিক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কমানো দরকার। সেই দিকটা সরকার যদি দেখে। আর দিনমজুরদের পারিশ্রমিক বাড়ানো উচিত। আর একটা জিনিস চাই, সন্তানজন্মের সময় প্রসূতিরা যেন ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পান, সে যে ধর্ম বা জাতেরই হোন না কেন। আর একটা জিনিস, নেতা-নেত্রীরাও যেন নিজেদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়ান। নেতারা যেন সরকারি হাসপাতালেই পরিবারের চিকিৎসা করান। এগুলো দরকার।
প্রশ্ন: সংগীতজগতের কোন দিকটার উন্নতির প্রয়োজন বলে আপনার মনে হয়?
শিলাজিৎ: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি একটা জটিল ইন্ডাস্ট্রি। শিল্পী হিসেবে আমাদের কাজ নিয়ে, আমাদের অহংকারটা খুব মিসিং। শিল্পীরা নেতার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর থেকে কাজ আদায় করার জন্য জন্মান না। শিল্পীকে নেতারা সম্মান দেবেন। আমরা আমাদের মতো থাকতে চাই। আমরা কাজ করব। ভালো কাজ না করলে লোকে ফেলে দেবে। আমি কোনো সভায় গেলে তবেই আমাকে ডাকবে, আর সভায় না গেলে ডাকবে না, এটা করলে হবে না। সেটা আজ দেখছি না। তখন এখানকার তাবড় তাবড় বাম নেতা আমাকে মিছিলে হাঁটার জন্য বলেছিলেন। আমি হাঁটিনি। পরের সরকারের আমলেও আমন্ত্রণ এসেছিল, আমি রাজি হইনি। আমি বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম একমাত্র একবারই। আরজি করের আন্দোলনের সময়। এই মিছিলে হাঁটা বা না-হাঁটা নিয়ে বরাবর আমার সহশিল্পীরা পর্যন্ত ভয় দেখিয়েছিল। আরে, ঘোড়ার ডিম কী হবে! ঠিক কোথাও না কোথাও একটা সমর্পণ সেনগুপ্ত পেয়ে যাব।
প্রশ্ন: কখনও ভয় হয়নি কাজ হারানোর?
শিলাজিৎ: আমার সেই ক্ষমতাটুকু আছে, আমি আমারটুকু করে নেব। সেটা যে অবস্থাই থাকুক, যেটাই থাকুক, সিনেমায় যারাই থাকুক, ইন্ডাস্ট্রিতে থাকুক, আমি আমার ক্ষমতা দিয়ে করে নেব। কারণ, অভিনয়, গান ছাড়াও আরও অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে আমার। আমি ম্যাসাজকে পেশা করেও বেঁচে থাকতে পারি। আমি কথা বলতে পারি, ফলে রেডিও জকিও হয়ে যেতে পারি। আবার আমি সেলসম্যানও হতে পারি। আমার অতটা নিরাপত্তাহীনতা নেই।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্ম বা 'জেন জি'-দের নিয়ে আপনার কী মত?
শিলাজিৎ: এই ছবিটা, অর্থাৎ 'প্রত্যাবর্তন' নতুন প্রজন্মের। ছবিটার ফোকাস পয়েন্টটা, তিন প্রজন্মের মধ্যেকার দূরত্ব দেখিয়েছে সমর্পণ। আমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কগত নানা সংকট রয়েছে। আবার আমার সঙ্গে আমার সন্তানের সংকট রয়েছে, যেটা চিরন্তন। সেই ট্র্যাডিশন সমাজে এখনও চলছে। এত ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে সম্পর্কগুলো আটকে আছে এবং এটা সমর্পণ অদ্ভুত ভাবে তুলে ধরেছে ছবিতে।
প্রশ্ন: সংগীতমেলায় সুযোগের বিনিময়ে কাটমানি নেওয়া হত বলে অনেক শিল্পীই অভিযোগ করেছেন। আপনি সংগীতমেলায় যেতেন?
শিলাজিৎ: সংগীতমেলা থেকে একবার একজন ফোন করে আমাকে বলেছিলেন যে, রবীন্দ্র সদনে আমার নাকি একটা অনুষ্ঠান আছে অমুক তারিখে। অনুষ্ঠানের চার-পাঁচ দিন আগে ফোন করে বলা হয়েছিল আমন্ত্রণপত্র সদন থেকে এসে নিয়ে আসতে। তাতে আমি রাজি হইনি। আমি এসবে কোনো পাত্তা দিই না। আমি মনেই করতে পারছি না, গত চার-পাঁচ বছর আমাকে ডেকেছে বলে।
প্রশ্ন: আক্ষেপ হয়নি কখনো?
শিলাজিৎ: আমার কিছু এসে যায় না। ডাকল না বলে কাঁদতে বসব নাকি? আমি শো করি বেছে বেছে। আমারটুকু হলেই হল। আমাকে যেমন চলচ্চিত্র উৎসবে একবার ডেকেছিল। তখন একটা-দুটো ওই দালাল গোছের পরিচালক ছিল, টেলিভিশনে কাজ করে। ভালো ভালো কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। ওখানে গিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। তার পর থেকে আমাকে চলচ্চিত্র উৎসবে আর ডাকেনি। কোনো দিন কোনো সরকারি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হয়নি। এই জীবনে প্রথম আমি কোনো শপথগ্রহণে আমন্ত্রণ পেলাম। কিন্তু এত ভিড় ছিল যে, আমি পৌঁছাতে পারিনি। ওদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। চাইব, ওরা ইন্ডাস্ট্রির ভালো করুক, এইটুকুই।
সূত্র : আনন্দবাজার
