শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

পোলাও চালের বাজারে অস্থিরতা

প্রকাশিত - ৩০ জুলাই, ২০২৬   ১১:২৭ এএম
webnews24

২৪ঘন্টা অনলাইন : দেশের বাজারে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম। গত ছয় মাসে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা এবং খোলা সুগন্ধি চাল ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। কেউ দায় দিচ্ছেন রপ্তানিকে, আবার কেউ বলছেন এটি কৃত্রিম সংকটের ফল।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকার দুই দফায় ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর থেকেই দাম আরও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। গত জুন ও জুলাই মাসে ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৫০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগেও যে প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটিই ২১০-২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা চালের দামও বেড়ে অনেক জায়গায় ২০০ টাকায় পৌঁছেছে।

মুগদা বাজারে চাল কিনতে আসা এক ক্রেতা আব্দুস সত্তার বলেন, আগে ইলিশ বা চিংড়ি রপ্তানির কারণে দাম বাড়ার কথা শুনেছি। এখন পোলাও চালও রপ্তানি হওয়ায় দাম বেড়েছে বলে শুনছি। কৃষিপ্রধান দেশে সাধারণ মানুষের জন্য এমন দাম কষ্টকর।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, এক মাস আগেও ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সেটির দাম বেড়ে ৯ হাজার ৫০০ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে বস্তাপ্রতি প্রায় ২ হাজার টাকা বেড়েছে।

মানিকনগরের এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, পাইকারি বাজারে চাহিদা অনুযায়ী চাল পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানির কারণে সরবরাহ কমে গেছে—এমন ধারণা থেকেই দাম বাড়ছে বলে অনেকে মনে করছেন।

তবে বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মতো চাল রপ্তানি হয়েছে। বছরে দেশে প্রায় ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, অথচ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে উদ্বৃত্ত চালের একটি অংশ রপ্তানি করলে বাজারে সংকট হওয়ার কথা নয়। তার মতে, কিছু মিল মালিক চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।

অন্যদিকে দেশের অন্যতম খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, শুধু কৃত্রিম সংকট নয়; উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং বিয়ে-সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে চাহিদা বাড়ার কারণেও বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি সাময়িকভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন।

এদিকে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, রপ্তানিকে দায়ী করার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, দেশে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয় এবং চাহিদা মিটিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত থাকে। তাই কয়েক হাজার টন রপ্তানির কারণে বাজারে সংকট হওয়ার কথা নয়। বরং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রপ্তানির বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়াচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবহন বা জ্বালানি ব্যয়ের অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নয়। যদি সেটিই মূল কারণ হতো, তাহলে অন্যান্য চালের দামও একইভাবে বাড়ার কথা ছিল। বাস্তবে এটি একটি পরিকল্পিত কৃত্রিম সংকট।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সুগন্ধি চাল রপ্তানি ২০০৯-১০ অর্থবছরে শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত রেখেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ হাজার ৯৫৯ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও চলতি বছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩২০ টন করা হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি, উৎপাদন পরিস্থিতি এবং বাজারে সম্ভাব্য মজুত—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমানে সুগন্ধি চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কার্যকর বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন