২৪ঘণ্টা অনলাইন : ভোলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মহিষ পালন স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত এই মহিষ শুধু হাজারো খামারির আয়ের উৎসই নয়, এখানকার মহিষের দুধের কাঁচা টক দই পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও। অথচ এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চরাঞ্চলে মহিষ রক্ষায় সরকারিভাবে গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত টেকসই কিল্লা বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে ঘূর্ণিঝড়, অতিজোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস এলেই কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন ও মনপুরার ৮৫টি চরাঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ জন খামারি ১৭৮টি বাথানে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ পালন করছেন। এর মধ্যে ৩২ হাজার বলদ এবং ৯২ হাজার গাভী মহিষ রয়েছে। প্রতিদিন এসব মহিষ থেকে ৮ থেকে ১০ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়। প্রতিটি মহিষের গড় বাজারমূল্য প্রায় সোয়া এক লাখ টাকা।
তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই গুরুত্বপূর্ণ খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় টানা তিন দিনের জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ৯ হাজার ৯৩১টি মহিষ ভেসে যায়। পরে অধিকাংশ উদ্ধার হলেও ২৬৯টি মহিষ মারা যায়। এতে প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। একই দুর্যোগে বহু গরুও মারা যায়, যার ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা।
চলতি বছরের জুলাই মাসেও অতিজোয়ারে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে ৫৪৭টি মহিষ ভেসে যায়। দৌলতখানের নেয়ামতপুর চরেই ১৮ জন খামারির ১০০টি মহিষ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। অধিকাংশ উদ্ধার হলেও কয়েকটি মহিষের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
খামারিদের অভিযোগ, মানুষের জন্য চরাঞ্চলে মুজিব কিল্লা থাকলেও মহিষ ও অন্যান্য গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় নেই। বাধ্য হয়ে তারা নিজেদের উদ্যোগে মাটি উঁচু করে অস্থায়ী কিল্লা তৈরি করেন। কিন্তু বড় জলোচ্ছ্বাসে সেগুলোও টিকে থাকে না।
দৌলতখানের খামারি মো. জাকির হোসেন বাবুল জানান, সাম্প্রতিক অতিজোয়ারে তার চারটি মহিষ নিখোঁজ হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ লাখ টাকা। তিনি বলেন, সরকারিভাবে টেকসই কিল্লা নির্মাণ করা হলে এমন ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান খামারি আবুল কাশেম, বেলায়েত হোসেন ও সিরাজ মুন্সি। তারা বলেন, নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় প্রতিবার দুর্যোগের সময় মহিষ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়। অনেক সময় জোয়ারের পানি এত দ্রুত বাড়ে যে মহিষ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, মহিষ খামারিদের জন্য সরকারি বিমা সুবিধা চালু এবং দ্রুত টেকসই কিল্লা নির্মাণ করা জরুরি। তা না হলে মহিষ পালন নিরুৎসাহিত হবে এবং জিআই স্বীকৃত ভোলার ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের টক দইয়ের উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান জানান, জেলার চরাঞ্চলে মহিষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অন্তত ২৫০টি টেকসই কিল্লা প্রয়োজন। পাশাপাশি মিঠাপানির উৎস নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে জাতীয় সম্পদ হিসেবে মহিষের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, চরাঞ্চলে মহিষের নিরাপত্তার জন্য কিল্লা নির্মাণ একটি নীতিগত ও অবকাঠামোগত বিষয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় মহিষ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
