শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বীজভাণ্ডার কি মাটির নিচেই?

প্রকাশিত - ২৯ আগস্ট, ২০২৬   ০২:৩৬ পিএম
webnews24
২৪ঘণ্টা অনলাইন

নরওয়ের স্বালবার্ডের বরফে ঢাকা পাহাড়ের ভেতরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফসলের বীজ। বিশ্বের নানা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ফসলের বীজের ব্যাকআপ সংরক্ষণের এই স্থাপনাটি পরিচিত ‘স্ভালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট’ নামে। বিপর্যয়ের সময় ফসলের কোনো জাত বা বৈচিত্র্য হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বীজভাণ্ডার হয়তো কোনো সুরক্ষিত ভল্টে নয়, বরং আমাদের পায়ের নিচেই রয়েছে। মাটির মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে জমা থাকা বিপুলসংখ্যক বীজই তৈরি করে ‘সয়েল সিড ব্যাংক’ বা মাটির বীজভাণ্ডার।

স্বালবার্ডের বীজ ভল্টে ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি বীজের নমুনা সংরক্ষিত হয়েছে। প্রতিটি নমুনা নির্দিষ্ট পরিবেশে রাখা, নথিভুক্ত এবং প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের উপযোগী করে সংরক্ষণ করা হয়। এটি মূলত ভবিষ্যতের জন্য মানুষের তৈরি একটি বৈশ্বিক বীমাব্যবস্থার মতো কাজ করছে।

অন্যদিকে, প্রকৃতির বীজভাণ্ডারের নেই কোনো তালিকা, দরজা কিংবা পাহারাদার। গাছ থেকে ঝরে পড়া, বাতাসে ভেসে যাওয়া, পানি বা প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য বীজ মাটিতে জমা হয়। অনেক বীজ দীর্ঘ সময় মাটির নিচে সুপ্ত অবস্থায়ও থাকতে পারে।

এই প্রাকৃতিক বীজভাণ্ডার কোনো বন বা বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো বন আগুনে ধ্বংস হলে কিংবা বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, মাটির নিচে থাকা বীজ উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন উদ্ভিদের জন্ম দিতে পারে।

প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজারের বেশি বীজ

মাটির নিচে থাকা এই প্রাকৃতিক বীজভাণ্ডারের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য সুইডিশ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের গবেষকেরা বিশ্বের ৯৪টি দেশের ৩ হাজার ৯৬টি মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রায় ১ হাজার ৪০০টি গবেষণা থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্যের মধ্যে ছিল বিপুলসংখ্যক বীজ ও চারার হিসাব। গবেষণার ফল অনুযায়ী, পৃথিবীর স্থলভাগ, জলাভূমি ও জলজ পরিবেশ মিলিয়ে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ৫ হাজারেরও বেশি বীজ মাটির মধ্যে থাকতে পারে।

তবে বেশি বীজ থাকা মানেই বেশি প্রজাতি থাকা নয়- গবেষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও উঠে এসেছে।

উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি হলেও মাটির নিচে বীজের ঘনত্ব কম হতে পারে। অন্যদিকে কৃষিজমিতে বিপুলসংখ্যক বীজ পাওয়া গেলেও সেগুলোর প্রজাতিগত বৈচিত্র্য তুলনামূলক কম।

জীববৈচিত্র্য হারানোর নতুন আশঙ্কা

গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে মানুষের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ নিয়ে। গবেষকেরা দেখেছেন, তুলনামূলকভাবে অক্ষত পরিবেশের মাটির বীজভাণ্ডারে উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশি।

এর অর্থ হলো, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রভাব শুধু মাটির ওপরে থাকা উদ্ভিদসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাটির নিচে ভবিষ্যতের উদ্ভিদসমাজ গড়ে তোলার জন্য যে বীজভাণ্ডার রয়েছে, তার বৈচিত্র্যও কমে যেতে পারে।

এ কারণে স্বালবার্ডের মতো বীজ সংরক্ষণাগারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। প্রকৃতির মাটির বীজভাণ্ডার কোনো স্থায়ী ও নিরাপদ সংরক্ষণাগার নয়। পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর গঠন এবং বৈচিত্র্যও বদলে যেতে পারে।

গবেষণাটি তাই শুধু পৃথিবীর মাটির নিচে কত বীজ রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেনি। বরং এটি নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে- প্রকৃতি যদি তার নিজস্ব বীজভাণ্ডারের বৈচিত্র্য হারাতে থাকে, তাহলে কোনো বন বা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়ার পর শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করে তার স্বাভাবিক পুনর্জন্ম কি সম্ভব?

বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ভবিষ্যতের উদ্ভিদ ও খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় বরফের নিচে সংরক্ষিত বীজের পাশাপাশি মাটির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এই প্রাকৃতিক বীজভাণ্ডার সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন