২৪ঘণ্টা অনলাইন : একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে বাঁশের তৈরি চালুনি, ডালি, কুলা, ঝুড়িসহ নানা সামগ্রী ছিল নিত্যদিনের ব্যবহার্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিকের পণ্যের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে গেছে। ফলে নীলফামারীতে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন বাঁশ কারিগররা।
নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের রামগঞ্জ গ্রামের সহদেব রায় প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশের কাজ করছেন। বাবার কাছ থেকে শেখা এই পেশাকে তিনি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। প্রতিদিন উঠানে বসে বাঁশ চেঁছে চালুনি, ডালি কিংবা কুলা তৈরি করেন। তবে আগের মতো এসব পণ্য বিক্রি হয় না বলে হতাশ তিনি।
সহদেব রায়ের ভাষ্য, আগে হাটে পণ্য নিয়ে গেলেই সহজে বিক্রি হয়ে যেত। এখন বাজারজুড়ে প্লাস্টিকের ডালা, ঝুড়ি ও চালুনি। ফলে বাঁশের পণ্য নিয়ে বসে থাকতে হয়, বিক্রি হলেও তা খুবই কম।
ডোমার উপজেলার বড়রাউতা গ্রামের দেবীরডাঙ্গা এলাকাতেও কয়েকটি পরিবার এখনো এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রেখেছে। বাড়ির উঠানে পুরুষেরা বাঁশ চেঁছে কাঁচামাল প্রস্তুত করেন, আর নারীরা সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। কখনো স্কুলফেরত শিশুরাও পরিবারের কাজে সহযোগিতা করে।
কারিগর হরিদাশ জানান, বাঁশের কাজই তাদের পরিচয়। কিন্তু পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ খুবই কম। একটি বাঁশ দিয়ে ১০ থেকে ১২টি ডালি তৈরি করা গেলেও সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি ডালিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত থাকে। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে জানান তিনি।
কারিগরদের অভিযোগ, আগে একটি বাঁশ ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন তা কিনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। অথচ তৈরি পণ্যের দাম সেভাবে বাড়েনি। এতে কাঁচামালের খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
অনেক কারিগরের নিজেদের চাষের জমিও নেই। বসতভিটাই তাদের শেষ সম্বল। ফলে সারাদিন পরিশ্রম করেও আয় নিশ্চিত করতে পারেন না তারা। এ কারণে নতুন প্রজন্মও ধীরে ধীরে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেউ শহরে দিনমজুরি করছেন, আবার কেউ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
বাঁশশিল্প টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে কারিগরদের দাবি, শুধু ঋণ দিলেই হবে না; তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে।
বাঁশের কুটিরশিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এবং বহু প্রজন্মের ঐতিহ্যের অংশ। প্লাস্টিকের পণ্যের সহজলভ্যতায় মানুষের জীবন কিছুটা সহজ হলেও এর প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশশিল্পের দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও ঐতিহ্য।
কারিগর সহদেব রায়ের কথায় উঠে আসে তাদের প্রত্যাশা—এই পেশাটি বেঁচে থাকুক, নতুন প্রজন্ম যেন বাবার পেশা নিয়ে লজ্জা না পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
