২৪ঘণ্টা অনলাইন : খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের সবুজ পাহাড়, রহস্যময় সুড়ঙ্গ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন দেশ-বিদেশের পর্যটক। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো। তবে এর ঠিক পাশেই পর্যটন পাড়া ও পুনর্বাসন এলাকায় বসবাসরত প্রায় ১৫০ পরিবারের জীবন এখনো নানা মৌলিক সংকটে আটকে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরাপদ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব, কাঁচা সড়ক ও অনিয়মিত কর্মসংস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। তিনটি পাড়ায় পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস হলেও পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
তীব্র পানির সংকট : এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি নিরাপদ পানির সংকট। বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনা ও বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন পাহাড়ের নিচের ছড়ায় কুয়া খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
তিনটি পাড়ার বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি কুয়া। শুষ্ক মৌসুমে এসব কুয়াই হয়ে ওঠে পানির প্রধান উৎস। ভোররাত থেকেই পানির জন্য সিরিয়াল ধরতে হয়। অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যায় না। কুয়ার পানিতে ময়লা ও বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মানিক কুসুম ত্রিপুরা জানান, বর্ষায় ঝরনার পানি পাওয়া গেলেও বর্ষা শেষ হলে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে পরিবারের সদস্যদের দিনের বড় একটি সময় পানির পেছনে ব্যয় করতে হয়।
এলাকার বিদ্যালয় ও বাসিন্দাদের ব্যবহারের জন্য ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংক স্থাপন করা হলেও সেটি বর্তমানে অকেজো। ফলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের পানির সংকট আরও বেড়েছে।
শৌচাগারেও সংকট: পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাবও প্রকট। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবারের টিনসেট শৌচাগার রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারের শৌচাগারের অবস্থা নাজুক।
পানির সংকটের কারণে শৌচাগার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও দুর্ভোগের।
ঘরবাড়ি বদলেছে, বদলায়নি জীবনমান : একসময় এ এলাকার অধিকাংশ বাড়ি ছিল বাঁশ, ছন ও মাচাং কাঠামোর। সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবার মাটির দেয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি করেছে। ঘরের কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সংকট কাটেনি।
অধিকাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও কয়েকটি বাড়িতে এখনো রাতে কুপি বাতির ওপর নির্ভর করতে হয়।
সড়ক যোগাযোগেও ভোগান্তি: আলুটিলা পর্যটন পাড়ার ভেতরে এখনো কোনো পাকা সড়ক নেই। কোথাও ইট সলিং রাস্তা থাকলেও বেশ কিছু পথ কাঁচা। বর্ষায় এসব সড়ক কাদা ও পানিতে পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা চন্দ্রপল ত্রিপুরা বলেন, গ্রামের ভেতরে পাকা রাস্তা না থাকায় বর্ষায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ সহজ হতো।
কমেছে জুমচাষ, বেড়েছে দিনমজুরি নির্ভরতা : আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকার অনেক পরিবার একসময় জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে জুমের ফলন কমে যাওয়া ও চাষের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আগের মতো আয় করতে পারছেন না তারা।
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক ও বিভিন্ন মৌসুমি কাজে যুক্ত। ফলে অনেক পরিবারের আয় অনিয়মিত।
স্থানীয় কার্বারি সূর্য কিরণ ত্রিপুরা বলেন, তিনটি পাড়ায় প্রায় ১৫০ পরিবারের বসবাস। অধিকাংশ পরিবার দরিদ্র। পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে কিছু কর্মসংস্থান তৈরি হলেও বেশিরভাগ মানুষ এখনো পিছিয়ে রয়েছেন।
পর্যটনের সুফল আরও ছড়িয়ে দেওয়ার দাবি : আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় কয়েকজন চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কেউ দোকান পরিচালনা করেন, কেউ ডাব, জুমের ফসল, মৌসুমি ফলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। তবে পর্যটকের সংখ্যা ও মৌসুমের ওপর এসব আয়ের বড় অংশ নির্ভরশীল।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য চন্দ্র কিরণ ত্রিপুরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আশপাশের মানুষের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের পানি, স্যানিটেশন ও কর্মসংস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বন বিভাগের জুমিয়া পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৪০টি পরিবারকে এখানে পুনর্বাসন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরও ৩৩টি এবং ১৫টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবারের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৫০ হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন পাড়া ও পুনর্বাসন এলাকার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, অকেজো পানির ট্যাংক সচল, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তাদের প্রত্যাশা, আলুটিলার পর্যটনের আলো শুধু পর্যটনকেন্দ্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থেকে আশপাশের জনপদের মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আনবে
