২৪ঘণ্টা অনলাইন: শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ও আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। ৮ অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি সই হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি মেরামতের দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে টার্মিনালের মালিকানা ও সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। দুই পক্ষ সম্মত হলে চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
চুক্তিতে যা আছে: নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, এনসিটি আধুনিকায়ন ও পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ৬০০ কোটি টাকা সাইনিং মানি পাবে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দর থেকে সরকার প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা পাবে এবং রাজস্বের ৬৭ শতাংশ সরকারের অংশ থাকবে।
সরকারের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে এবং জাহাজ ও কনটেইনারের অপেক্ষার সময় কমবে। পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রী বলেন, বন্দরের মালিকানা, নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বেই থাকবে। কনটেইনার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আর পুরো বন্দর ইজারা দেওয়া এক বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চুক্তি হতে এত সময় লাগল : এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের আলোচনা শুরু হয় ২০১৯ সালে। ২০২৩ সালের মার্চে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও ধর্মঘটের মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়। তখন বিএনপির নেতারাও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন।
তবে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আবারও চুক্তির আলোচনা শুরু করে। চলতি বছরের ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর বৃহস্পতিবার চুক্তি সই হয়।
চুক্তি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারগুলো বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বর্তমান সরকার কয়েক মাস ধরে আলোচনা করে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।
শ্রমিকদের আপত্তির কারন: এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ। তাঁদের আশঙ্কা, বিদেশি কোম্পানি দায়িত্ব নিলে দেশীয় ব্যবস্থাপনা দুর্বল হতে পারে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবিরের দাবি, দেশীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা করা সম্ভব। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবর্তে পায়রা ও মোংলা বন্দরের উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম মনে করেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে কনটেইনার পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত সড়ক ও রেল অবকাঠামোর অভাবের মতো সমস্যাগুলো সমাধান করাও জরুরি। একই সঙ্গে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দাবি, এই চুক্তির কারণে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই। বরং বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের ফলে কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সামনে চ্যালেঞ্জ: চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল দিয়ে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামা করে। ফলে এর পরিচালনায় পরিবর্তন আমদানি-রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
চুক্তির সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা, রাজস্ব আয় এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার ওপর। সরকার আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগের যে প্রত্যাশা করছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
