শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

কক্সবাজারের হোপ হাসপাতালে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি কর্মশালা

প্রকাশিত - ১২ অক্টোবর, ২০২৬   ০৭:৫৫ পিএম
webnews24

২৪ঘণ্টা অনলাইন : কক্সবাজারের হোপ হাসপাতালে গত ৫ অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি কর্মশালা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। 'ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব গাইনোকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স' (ফিগো) এবং 'ফিস্টুলা ফাউন্ডেশন-ইউএসএ'-এর সহযোগিতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় ১৮ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয় এবং তাদের মধ্যে ১৪ জনের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে চিকিৎসাবঞ্চিত বিপুলসংখ্যক ফিস্টুলা রোগীর সেবায় যোগ্য সার্জনের সংখ্যা বৃদ্ধি করাই এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য।

দেশের ফিস্টুলা সার্জনদের দক্ষতা উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত পরিচর্যার মাধ্যমে নিরাপদে ও কার্যকরভাবে সার্জারি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কর্মশালায় স্থানীয় চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সাধারণ থেকে জটিল ফিস্টুলার রোগ নির্ণয়, শ্রেণিবিন্যাস এবং অস্ত্রোপচারের কৌশল শেখানো হয়। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারপূর্ব স্ক্রিনিং, অস্ত্রোপচারপরবর্তী সেবা এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণসহ রোগীর সার্বিক সহায়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে কর্মশালা পরিচালনা করেন ডা. পিটার মাজিগে ও ডা. জেমস চাপা — তাঞ্জানিয়ার সিসিবিআরটি (CCBRT) হাসপাতালের সার্জন ফিগো সনদপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ফিস্টুলা। একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ফিস্টুলা সার্জন অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার। এ ছাড়া ফেলো হিসেবে অংশগ্রহণ করেন হোপ হাসপাতালের ডা. নৃন্ময় বিশ্বাস ও ডা. ফারহানা মুন্নী এবং মামস ইনস্টিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড উইমেন্স হেলথের ডা. ফাহমিদা জাবিন ও ডা. তাহসিন ইসলাম।

তাঞ্জানিয়ার বিশেষজ্ঞ ডা. জেমস চাপা বলেন, ‘কক্সবাজারের হোপ হাসপাতালে আয়োজিত এই কর্মশালাটি বাংলাদেশে ফিস্টুলা চিকিৎসা সেবাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রশিক্ষক ও স্থানীয় সার্জনদের যৌথ কার্যক্রমের ফলে অভিজ্ঞতা বিনিময়, পরামর্শদান এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হওয়ার এক মূল্যবান সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

প্রসবজনিত ফিস্টুলা হলো মূত্রাশয় এবং/অথবা মলদ্বারের ভেতরের একধরনের ক্ষত বা ছিদ্র, যার ফলে অনবরত প্রস্রাব বা পায়খানা নির্গত হতে থাকে। সন্তান প্রসবের সময় অতিরিক্ত বিলম্ব বা বাধা সৃষ্টি হলে প্রজনন অঙ্গের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে মাংসপেশি নষ্ট বা পচে যায়। প্রসবের ৫-৭ দিন পর সেই পচন ধরা টিস্যু খসে পড়ে ছিদ্রের সৃষ্টি হয়, ফলে রোগীর প্রস্রাব-পায়খানার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি এটি নারী জীবনের জন্য এক ভয়াবহ সামাজিক ও মানসিক অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়—

  • শরীর থেকে অনবরত দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে আক্রান্ত মায়েরা চরম সামাজিক অবহেলার শিকার হন।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী ও পরিবার তাদের পরিত্যাগ করে এবং তারা আত্মীয়স্বজনের কাছেও আশ্রয় পান না।
  • গভীর মানসিক বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও সামাজিক নিগ্রহের মধ্য দিয়ে তাদের জীবন কাটাতে হয়।
  • পশ্চিমা বিশ্বে উন্নত প্রসূতি সেবার কারণে ফিস্টুলা এখন নেই বললেই চলে। তবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে এখনও এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। গ্রামীণ দাই বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবের ফলেই মূলত এই সমস্যাটি সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের ফিস্টুলা পরিস্থিতি ও হোপ ফাউন্ডেশনের ভূমিকা
২০১৬ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৯,৭৫৫ জন ফিস্টুলা আক্রান্ত নারী রয়েছেন। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,২০০ জন নারী এ রোগে আক্রান্ত হন, যার বিপরীতে বছরে মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ জন অস্ত্রোপচারের সুযোগ পান। দক্ষ সার্জনের সংকট থাকায় অনেকে বহু বছর ধরে এই দুর্ভোগ সহ্য করছেন।

হোপ ফাউন্ডেশন ২০১১ সাল থেকে বিনামূল্যে ফিস্টুলা নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে
প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ১,২০০টি ফিস্টুলা অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্পন্ন করেছে।
হোপ ফাউন্ডেশনের নিজস্ব একটি নিবেদিত টিম ও ফিগো-প্রশিক্ষিত উচ্চস্তরের অস্ত্রোপচার দল রয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
একুশে পদকপ্রাপ্ত সার্জন অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, "মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমেই হোপ ফিস্টুলাকে প্রতিরোধ করছে। দেশকে ফিস্টুলামুক্ত করার ক্ষেত্রে হোপের অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।"

২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান—

  • ফিস্টুলা শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। দক্ষ মিডওয়াইফের মাধ্যমে সার্বজনীন মাতৃত্ব স্বাস্থ্যসেবা, গর্ভকালীন সেবা এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশকে ফিস্টুলামুক্ত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন—
  • সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০৩০ সালের মধ্যে সকল রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা।
  • দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া।
  • মেডিকেল শিক্ষার কারিকুলামে ফিস্টুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন