শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

দুবলার চরে কোটি টাকার অর্থনীতি, উপেক্ষিত মৌলিক সুবিধা

প্রকাশিত - ১২ অক্টোবর, ২০২৬   ১০:৫০ পিএম
webnews24
ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট

২৪ঘণ্টা অনলাইন: শুঁটকি উৎপাদনে রাজস্ব ও কর্মসংস্থান, রাসমেলাকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা; কিন্তু পরিবেশ সুরক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দুবলার চর। মৌসুমি শুঁটকি উৎপাদন, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং ঐতিহ্যবাহী রাসমেলাকে ঘিরে প্রতিবছর প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয় এই বিচ্ছিন্ন জনপদে। এখানকার শুঁটকি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সরকারের কোষাগারে জমা হয় কোটি টাকার রাজস্ব। অথচ এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জেলে ও শ্রমিকদের বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও জরুরি যোগাযোগের সুযোগ কতটা নিশ্চিত, পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যবস্থাপনাই বা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।

দুবলার চরের সম্ভাবনা তাই কেবল শুঁটকি উৎপাদন কিংবা পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—এই তিনটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

শুঁটকিতে কোটি টাকার রাজস্ব

সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত দুবলার চরে চলে শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা এখানে এসে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে বাছাই, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন—পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুবলার চরে প্রায় ৫ হাজার ১০০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এই হিসাব চরটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটি চিত্র তুলে ধরে। পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত জেলে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সামনে আনে।

তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই বিস্তার ঘটছে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম, অস্থায়ী বসতি ও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয় ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ কমানোও জরুরি।

জীবিকার কেন্দ্রে, সুবিধার বাইরে

শুঁটকি মৌসুমে আলোরকোল, মেহেরআলীর খাল ও নারিকেলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। মাসের পর মাস এসব এলাকায় অবস্থান করেন জেলে ও শ্রমিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপদ জ্বালানি ও জরুরি যোগাযোগের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। এতে জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি শব্দদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার সময় চিকিৎসাসেবা ও দ্রুত যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ভোগান্তি বাড়াতে পারে। টেলিটক ছাড়া অন্য মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রাপ্যতা নিয়েও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে।

তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মৌসুমি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা, বর্জ্য সংগ্রহ এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

রাজস্বের পাশাপাশি জবাবদিহি

দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন থেকে রাজস্ব আদায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যবস্থাপনার সাফল্য পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। উৎপাদনকেন্দ্রের বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ ও অপসারণ করা হচ্ছে, মাছ শুকানোর কাজে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অস্থায়ী বসতিতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় থাকছে কি না—এসব প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।

শুঁটকি উৎপাদনের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করা হলে আশপাশের মাটি ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিয়মিত তদারকি জরুরি। একই সঙ্গে বন বিভাগের অনুমতি, লাইসেন্সের শর্ত এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়, উৎপাদনের পরিমাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত তদারকিসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। কোথায় কী ঘাটতি রয়েছে এবং তা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

রাসমেলা ও পর্যটনে সম্ভাবনা

দুবলার চরের পরিচিতির আরেকটি বড় অংশ ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা ও পুণ্যস্নান। কার্তিকী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে প্রতিবছর পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। বঙ্গোপসাগরের উপকূল, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শুঁটকি উৎপাদনের কর্মযজ্ঞও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

পরিকল্পিত পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নৌপরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, স্থানীয় পণ্য বিপণন ও অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয়ের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই পর্যটন খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। পর্যটকের চাপ সামলানোর সক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য পর্যটক চলাচলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা, নৌযানের পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং রাসমেলার সময় নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি থাকা দরকার। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন।

উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন

দুবলার চরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বন বিভাগ, মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলে ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথমত, মৌসুমি বসতিতে নিরাপদ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুঁটকি উৎপাদন ও পর্যটনকেন্দ্রিক বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিরাপদ অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনায় ধারণক্ষমতা ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

দুবলার চর শুধু শুঁটকি উৎপাদনের একটি কেন্দ্র নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস, সরকারি রাজস্বের একটি ক্ষেত্র এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাময় গন্তব্য। এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য রাজস্ব ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারলেই দুবলার চরের সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে রূপ নিতে পারে।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন
২৪ঘণ্টা অনলাইন : ‎মোংলায় এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রায় দুই মাস পর দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ইকরামুল শেখ (৪০) ও মীর আলী (৪৮)। পুলিশের...