দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মোংলা বন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে আগামীকাল ২২ অক্টোবর খুলনা, মোংলা ও সুন্দরবন সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক দিনের এ সরকারি সফরে তিনি হেলিকপ্টার থেকে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান এলাকায় অবতরণ, মোংলা নৌঘাঁটিতে সভায় অংশগ্রহণ, মোংলা বন্দরের জেটি এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
নির্বাচনের পর সরকারপ্রধান হিসেবে সুন্দরবন, মোংলা বন্দর ও রূপসা-পশুর নদী অববাহিকাসংলগ্ন অঞ্চলে এটিই তাঁর প্রথম সফর। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন, বন্দরনির্ভর বাণিজ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হেলিকপ্টারে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ১০টার দিকে আকাশপথে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণের কথা রয়েছে তাঁর।
সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এ বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ, মাছ, কাঁকড়া, মধু ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় বহু মানুষের জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার বিস্তার, নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এ বনাঞ্চল। প্রধানমন্ত্রীর আকাশপথে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের সামগ্রিক অবস্থা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সরেজমিন ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নলিয়ান থেকে নৌপথে মোংলা
নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী নৌপথে বাগেরহাটের মোংলায় অবস্থিত বানৌজা মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর পৌনে ১টার দিকে সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তাঁর। এরপর মধ্যাহ্নবিরতি শেষে বেলা পৌনে ২টার দিকে নৌঘাঁটির ওয়ার্ড রুমে আয়োজিত সভায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সভায় খুলনার বিভাগীয় কমিশনার এবং খুলনা ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আঞ্চলিক উন্নয়ন, চলমান কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। তবে সভার বিস্তারিত আলোচ্যসূচি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মোংলা বন্দর ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিকেল ৩টার দিকে মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বেজার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে মোংলা বন্দর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানি-রপ্তানিকারক, পরিবহন খাত এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এ বন্দর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্য ওঠানামার অবকাঠামো উন্নয়ন, নৌপথের নাব্যতা বজায় রাখা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মোংলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে সেখানে শিল্পকারখানা, সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সেবাখাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া আগাম কোনো হিসাব দেওয়া যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা জোরদার, প্রস্তুত প্রশাসন
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনার দাকোপ, নলিয়ান, সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট এলাকা এবং মোংলা বন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা সমন্বয় সভায় স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), পুলিশ, কোস্ট গার্ড, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন সফর নির্বিঘ্ন করতে যাতায়াত, অবস্থানস্থল এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। দাকোপের নলিয়ান এলাকায় হেলিকপ্টার অবতরণের স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ও যাতায়াত সমন্বয়ের কাজও এগিয়ে চলছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে আলাদা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মসূচি নির্ধারিত নেই বলে দাকোপ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সুন্দরবন সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ও জীবিকার প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বনজীবী, মধু সংগ্রহকারী, কাঁকড়া আহরণকারী এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য বন ও নদী-খালের সুস্থ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু বন্দর ও শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নদী-খালের নাব্যতা রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা নতুন প্রকল্প ঘোষণার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে সুন্দরবন, মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল সরেজমিনে পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, দিনের কর্মসূচি শেষে বিকেলে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
