২৪ঘণ্টা অনলাইন : প্রকৃতির বুকে ঋতুর পরিবর্তন এক চিরন্তন নিয়ম। কখনো গ্রীষ্মের তীব্র তাপ, কখনো বর্ষার অবিরাম বৃষ্টি, কখনো শরতের স্নিগ্ধ আকাশ, আবার কখনো শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল—প্রকৃতির প্রতিটি রূপেই ছড়িয়ে রয়েছে মহান আল্লাহর অসীম কুদরত ও প্রজ্ঞার নিদর্শন।ঋতুর এই পালাবদল মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করতে শেখায় এবং আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
পৃথিবীর দিন-রাতের আবর্তন, সূর্যের আলো ও তাপের তারতম্য, বৃষ্টিপাত, গাছপালার সজীবতা এবং প্রকৃতির রূপবদল—সব কিছুই এক সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অধীন, যার পেছনে রয়েছে মহান স্রষ্টার অপার মহিমা। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২২)পৃথিবীতে বৃষ্টিপাত মানুষের জীবন, কৃষি, প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুষ্ক জমিতে বৃষ্টি হলে মাটি সজীব হয়ে ওঠে, মাঠে ফসল জন্মায়, গাছপালায় নতুন পাতা গজায় এবং প্রকৃতি ফিরে পায় প্রাণের স্পন্দন। এ দৃশ্য মানুষের সামনে আল্লাহর অপার অনুগ্রহের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনিই মানুষের নিরাশ হয়ে পড়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন।’ (সুরা : শূরা, আয়াত : ২৮)কখনো দীর্ঘ খরায় মানুষ যখন বৃষ্টির প্রত্যাশায় থাকে, তখন বৃষ্টি তাদের জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসে।
তবে বৃষ্টি কখনো উপকার, আবার কখনো ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই মুমিনের উচিত প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখা। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘অতঃপর আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি, তারপর তাতে সব ধরনের উৎকৃষ্ট উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১০) ঋতুর পরিবর্তন মানুষকে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখায় না; বরং জীবন সম্পর্কে গভীর কিছু শিক্ষা দেয়। গ্রীষ্মের তীব্র গরম চিরস্থায়ী নয়, তেমনি শীতের তীব্রতাও একসময় কেটে যায়।
বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে যেমন আকাশ পরিষ্কার হয়, তেমনি জীবনের দুঃসময়ও একসময় পেরিয়ে যেতে পারে। মুমিন এ পরিবর্তনগুলো থেকে আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা উপলব্ধি করে এবং বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)
প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও আবহাওয়ার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, আকাশে মেঘ বা প্রবল বাতাস দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারায় উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠত। বৃষ্টি হলে তিনি আনন্দিত হতেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁর আশঙ্কা হতো, এ পরিস্থিতি তাঁর উম্মতের ওপর কোনো বিপর্যয় নিয়ে আসে কি না। আর বৃষ্টি হলে তিনি বলতেন, এটি আল্লাহর রহমত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৯৯)
প্রতিটি ঋতু মানুষের সামনে ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন ও দায়িত্ব নিয়ে আসে। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরমে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, বর্ষায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা শীতে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে গরম কাপড় বিতরণ করা—এসব মানবিক কাজ ইসলামের উদার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
তাই প্রকৃতির পরিবর্তন তখনই আমাদের জীবনে প্রকৃত তাৎপর্য বহন করবে, যখন তা আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করবে, আমলকে সুন্দর করবে এবং মানবিক গুণাবলিকে সমৃদ্ধ করবে। ঋতু যেমন পৃথিবীকে নতুন রূপে সাজায়, তেমনি আমাদেরও উচিত প্রতিটি নতুন সময়কে আত্মশুদ্ধি, নেক আমল ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।
খানে বিস্তারিত সংবাদ লেখা শুরু করুন...
