২৪ঘন্টা অনলাইন: জেলায় এ বছর অনুকূল আবহাওয়া, কৃষকের কঠোর পরিশ্রম আর পরিচর্যায় উৎপাদিত আগাম জাতের আমন ধান পাকতে শুরু করেছে।মাঠজুড়ে কাঁচা-পাকা ধানের সমারোহে ছড়িয়েছে সোনালি আভা। শুরু হয়েছে পুরোদমে ধান কাটা ও মাড়াই। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার জেলায় আমনের অধিক ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে পাঁচ উপজেলায় প্রায় ২০ শতাংশ জমির ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষক ও শ্রমিকেরা মাঠে ধান কাটতে ব্যস্ত রয়েছেন। কেউ বাড়িতে ধান মাড়াই করছেন, আবার কেউ নতুন ধান বাজারে বিক্রি করছেন।কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, স্থানীয় শ্রমিকের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও শ্রমিক এসেছেন। তবে শ্রমিক সংকট, মজুরি বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো ফলন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮৬ হাজার ৫শ’ ৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। এ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬শ’ ২৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের আমবাড়ী গ্রামের কৃষক ঈমান মিয়া (৪৪) বলেন, ধান কাটার শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি তাদের মজুরিও বেড়েছে। বেশি মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করা কঠিন হওয়ায় তিনি নিজেই জমির ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে গত মৌসুমের তুলনায় এবার আমনের ফলন ভালো হবে বলে আশা করছেন তিনি।
একই উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আইয়ুব আলী (৪৮) বলেন, তার ক্ষেতের প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। কিছু ধান শুকানো ও মাড়াই চলছে। ইতোমধ্যে প্রতি মণ ১ হাজার ১শ’ টাকা দরে পাঁচ মণ নতুন ধান বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
একই ইউনিয়নের কৃষক সুনীল চন্দ্র রায় (৬৬) বলেন, এবার ধানের ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য আশানুরূপ নয়। এক বিঘা জমিতে ধান চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ১৭ মণ ধান উৎপাদন হলে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণ ১ হাজার ১শ’ টাকা দরে মোট বিক্রি হবে ১৮ হাজার ৭শ’ টাকার ধান। সে হিসাবে পাঁচ বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ বাদে তার অবশিষ্ট থাকবে মাত্র ২৩ হাজার ৫শ’ টাকা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন তিনি।
কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের কৃষক ইব্রাহিম ইসলাম (৪২) বলেন, তিনি ২ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। জমি চাষ, রোপণ, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ অন্যান্য খরচের বাইরে শুধু শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা, মাড়াই ও বাড়িতে নেওয়া পর্যন্ত প্রতি বিঘায় তার ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২শ’ ৯০ টাকা। দুই বিঘায় এ খাতে মোট খরচ হয়েছে ৮ হাজার ৫শ’ ৮০ টাকা। অন্যান্য উৎপাদন খরচ হিসাব করলে আমাদের মত কৃষকের লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য থাকে। তাই উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকদের পাশে থাকার দাবি জানান সরকারের প্রতি।
আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুরের কৃষক মুসলেম ব্যাপারী (৫০) ও ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক নজির হোসেন (৫৫) বলেন, আমনের ফলন ভালো হলেও উৎপাদন থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে বাড়তি ব্যয় হওয়ায় উৎপাদিত ধান বিক্রির অর্থ থেকে প্রকৃত লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাদের মতে, শুধু ফলন বাড়লেই কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত হয় না; উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
সদর উপজেলার বড়বাড়ী বাজারের ধান ব্যবসায়ী মানিক মহাজন (৪৭) বলেন, বর্তমান বাজারে প্রতি মণ নতুন ধান ১ হাজার ১শ’ টাকা এবং পুরোনো চিকন ধান সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩শ’ ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ধানের মান, আর্দ্রতা ও বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দামের পার্থক্য হচ্ছে। নতুন ধানের সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকলে আগামী কয়েকদিনে ধানের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের কৃষক কাউসার হোসেন (৫৬), পাটগ্রাম উপজেলার জোংড়া ইউনিয়নের কৃষক মমিনুল হক (৬০) ও বাউরা ইউনিয়নের কৃষক আজগর আলী (৪০) একই মত পোষণ করে বলেন, ধানের পাশাপাশি খড় বিক্রি করেও কৃষকেরা বাড়তি আয় করছেন। তাদের মতে, ধান চাষ শুধু লাভ-লোকসানের হিসাব নয়; এটি কৃষকের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের অংশ। উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কৃষকরা ধান চাষ অব্যাহত রেখেছেন।তারা আরও বলেন, একই জমিতে মৌসুমভিত্তিক একাধিক ফসল পর্যায়ক্রমে আবাদ করা গেলে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব । লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনেকটা অনুকূলে থাকায় আমনের ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকরা পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান উৎপাদন করেছেন। নতুন ধান বাজারে আসায় চালের দাম স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
