শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ অনিশ্চিত

প্রধান উপদেষ্টা-তারেক রহমান বৈঠক শুক্রবার

প্রকাশিত - ১১ জুন, ২০২৫   ০৫:১৪ পিএম
webnews24

২৪ঘণ্টা অনলাইন : যুক্তরাজ্য সফররত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হবে আগামী শুক্রবার ১৩ জুন। আর এ বৈঠককে ‘বড় ইভেন্ট’ বা ‘মেজর পলিটিক্যাল ইভেন্ট’ বলে মনে করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সাক্ষাতে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে এবং নতুন ডাইমেনশন তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে প্রধান উপদেষ্টার এ সফরকে দ্বিপক্ষীয় বলা হলেও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকের কোনো সূচি এখনো ঠিক হয়নি। প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানিয়েছেন।

রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ১১ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা লন্ডন সফরে যাবেন বলে যখন ঘোষণা আসে, তখন থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। লন্ডনে ড. ইউনূস যে হোটেলে (হোটেল ডোরচেস্টার) উঠেছেন সেখানেই স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে এ বৈঠক হবে। ওখানেই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ইংল্যান্ডের হাউজ অব কমন্সের ডেপুটি লিডার অব দ্য হাউজ দেখা করবেন তারেক রহমানের বৈঠকের পর। এরপর অন্যান্য নেতা যারা আছেন তারা ওখানেই দেখা করবেন, ভেন্যু একটাই।’

এদিকে প্রধান উপদেষ্টার লন্ডন সফরটি অর্থনৈতিক প্রাপ্তির চেয়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুবই তাৎপর্য বয়ে আনবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশান জিন্নাত আরা নাজনীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক হবে, এটা খুবই ভালো দিক বলে আমি মনে করি। তারেক রহমান এখনো দেশে আসেননি, বহু বছর আসতে পারেননি। প্রধান উপদেষ্টার এ সফরে দেখা হলে তাদের মধ্যে যদি সমঝোতা বা এমন কিছু হয়, তাহলে সেটা খুবই ভালো একটা দিক হবে।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে লন্ডনে ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠককে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করছেন মির্জা ফখরুলও। এ বৈঠকের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সোমবার রাতে দলটির স্থায়ী কমিটির এক জরুরি বৈঠকও হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তারেক রহমান সবার সঙ্গে আলোচনা করেন। বৈঠকে অংশ নেয়ার বিষয়ে আলাদা করে সবার মত নেন। কয়েকজন নেতা বৈঠকে অংশ নেয়ার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করলেও দীর্ঘ আলোচনায় পর সবাই ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসেন।

এ তথ্য নিশ্চিত করে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বৈঠকের বিষয়টিকে আমাদের স্ট্যান্ডিং কমিটির পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি, এটা বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট তা কাটাতে পজিটিভ ভূমিকা রাখতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক যে প্রেক্ষাপট, যে অবস্থান, এটা (বৈঠক) একটা বড় ইভেন্ট। এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। জাতীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সম্পূর্ণ অথরিটি দিয়েছি।’

অন্তর্বর্তী সরকারকে আগামী নির্বাচনের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো বিষয়টি (এপ্রিলের প্রথম দিকে নির্বাচন) নিয়ে দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। আশা করি, সরকার এ বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করবে।’

ঘোষিত নির্বাচনের সময়টা ভোটের জন্য ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘রমজানের আগে প্রচার-প্রচারণায় অনেক সমস্যা হবে। প্রতিদিনই ইফতার মাহফিল করা লাগবে। নির্বাচনী ব্যয় দ্বিগুণ হবে। প্রচণ্ড গরমের কারণে সমাবেশে লোকজন আনা যাবে না। রাতে প্রোগ্রাম করতে হবে। তাছাড়া অতীতে দুটি বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া দেশে প্রায় সব জাতীয় নির্বাচন ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের দল বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এটি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যেকোনো সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, কারণ বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। আমরা বিপ্লবী দল না, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে চাই।’

এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক ঘিরে আজ লন্ডন যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। বিএনপির হাইকমান্ড তারেক রহমানই লন্ডনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ডেকে নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে শুক্রবার বৈঠক হচ্ছে বলে প্রেস সচিব শফিকুল আলমও নিশ্চিত করেছেন। তবে দুজনের মধ্যে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে জানতে চাইলে শফিকুল আলম বলেন, ‘মিটিংটার কোনো ফরম্যাট নেই। তারেক রহমান যেহেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দলের নেতা এবং ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, তো উনারা উনাদের মতো করে বসবেন, আলাপ হবে।’ প্রেস সচিব অবশ্য এও বলেন, ‘বাংলাদেশের এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনের ঘোষিত সময়, জুলাই চার্টার্ড, সংস্কার—এসব যেকোনো ইস্যু নিয়েই আলাপ হতে পারে। তবে কী আলাপ হবে সেটা উনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।’

ড. ইউনূস ও কিয়ার স্টারমারের বৈঠক অনিশ্চিত
প্রধান উপদেষ্টার এ সফরকে দ্বিপক্ষীয় বলা হলেও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকের কোনো সূচি এখনো ঠিক হয়নি। প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানিয়েছেন। বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবনে এ সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হবে কিনা এবং বৈঠক হলে তা কবে হবে?

শফিকুল আলম বলেন, ‘কিয়ার স্টারমারের, আমরা যেটা জানতে পারছি যে উনি সম্ভবত কানাডায় আছেন। কানাডা ভিজিট করছেন। আজকে (গতকাল) ব্রিটিশ এক পার্লামেন্টারি এমপি এসেছিলেন, উনি জানালেন যে উনি (প্রধানমন্ত্রী) কানাডায় আছেন। তারপরও কথাবার্তা হচ্ছে। যদি সময় বা শিডিউল ম্যাচ করে (সূচি মিললে) তাহলে মিটিং হবে। আর শিডিউলে যদি ম্যাচ না করে তাহলে এটা...এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। আমি এইটুকু বলতে পারি, এ মিটিংটা নিয়ে কাজ হচ্ছে।’

টিউলিপ সিদ্দিকের চিঠি পেয়েছি—প্রেস সচিব
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিকের পাঠানো চিঠি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি, একটা চিঠি এসেছে। চিঠির বিষয় হচ্ছে এটা একটা লিগ্যাল ইস্যু। এটা লিগ্যাল ওয়েতে অ্যাড্রেস করা হবে।’ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে অলপার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের ব্যানারে যুক্তরাজ্যের একদল সংসদ সদস্য সাক্ষাৎ করেন বলেও তিনি জানান। এ সময় টিউলিপ সিদ্দিক ছিলেন কিনা, জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, ‘না, টিউলিপ সিদ্দিক ছিলেন না।’ চারদিনের সরকারি সফরে গত সোমবার সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে তিনি হিথরো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

আওয়ামী লীগকে কি রাজনৈতিক দল বলা যায়, প্রশ্ন অধ্যাপক ইউনূসের
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস 'আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল বলা যায় কি-না', সেই প্রশ্ন তুলেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না- এমন আশঙ্কাকে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, 'তবে দেশ ও রাজনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে একটি সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত'।

বর্তমান সরকারের সময় মিডিয়ায় ক্রাকডাউন (সংবাদমাধ্যমের ওপর বল প্রয়োগ) এর অভিযোগ নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস দাবি করেন, তার সরকারের সময়েই সবচেয়ে বেশী স্বাধীনতা ভোগ করছে সংবাদ মাধ্যম, যা আগে কখনো হয়নি।

এই অনুষ্ঠানে তিনি জানান যে, জুলাই মাসে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে জুলাই চার্টার ঘোষণা করে তার ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচন হবে। সংস্কারের ইস্যুগুলোতে গণভোট দেয়া হচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, অনেকে মনে করেন গণভোট অর্থহীন। "কারণ অনেকেই বুঝবেন না কেন গণভোট। সে কারণে দলগুলো সবাই সম্মত হলে সেটা হবে বেশি বাস্তব ভিত্তিক। চারদিনের সরকারি সফরে লন্ডন সফররত অধ্যাপক ইউনূস যুক্তরাজ্যের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের রয়্যাল ইন্সটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত এক সংলাপে অংশ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব মন্তব্য করেছেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই চার্টারের জন্য দলগুলোকে এক করার বদলে ভোটারদের ওপর আস্থা রাখা হচ্ছে না কেন কিংবা জনগণকে সুযোগ না দিয়ে যে ঐকমত্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ কি-না -এমন প্রশ্নও করা হয়েছিলো অধ্যাপক ইউনূসকে।

তবে এই সফরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সাথে তার বৈঠক এখনো নিশ্চিত হয়নি। এই অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারে তার অংশ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দিয়েছেন।

নির্বাচন 'ফ্রি ও ফেয়ার না হওয়ার' আশঙ্কা
"কয়েকদিন আগে এপ্রিলের শুরুতে নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। কিন্তু অনেক বিতর্ক। আর্মি ও কিছু রাজনীতিকরা এ বছরের মধ্যে নির্বাচন চান। আওয়ামী লীগ দল ও শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ- যেটা অন্যতম বড় দল। সব মিলিয়ে অনেকেই বলছেন, নির্বাচনটি ফ্রি ও ফেয়ার হবে না"- শুরুতে এমন প্রশ্ন করা হয় অধ্যাপক ইউনূসকে। জবাবে তিনি বলেন, তার মতে এটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন। "সময় সঠিক ও জনগণ প্রস্তুত। যখন আপনি বহু বছর পর একটি নির্বাচন করছেন। সতের বছর পর আপনি একটি সত্যিকার নির্বাচন পাচ্ছেন। দেশে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যে তারা সত্যিই ভোট দিতে যাচ্ছেন"।

তিনি বলেন, সতের বছরে ভোটাধিকার দেওয়ার বয়স হয়েছে যাদের, তারা তাদের প্রথম ভোট দিতে পারেনি। "তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে ভোট দেওয়ার জন্য। তাদের কণ্ঠকে কখনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যেটা আমরা বলছি যে নতুন বাংলাদেশ"। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আগামী নির্বাচনটি একটা নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য রুটিন ভোট নয়, এটা নতুন বাংলাদেশের জন্য ভোট।

"আমরা এই অঙ্গীকারই করেছি, যেসব তরুণরা জীবন দিয়েছে তাদের স্বপ্নকে সম্মান করবো পুরনো বিদায় করবে নতুন বাংলাদেশের জন্য। আমরা পুরনো বাংলাদেশকে বিদায় বলে নতুন বাংলাদেশ তেরি করতে চাই," বলছিলেন তিনি। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশের জন্য তারা তিনটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন- এর একটি হলো সংস্কার।

"আমরা সব প্রতিষ্ঠান সংস্কার করতে চাই। সেজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কমিশন করেছি। যাতে মৌলিক পরিবর্তন করা যায়। অনেক সুপারিশ এসেছে। নির্বাচন, সংসদ, সংবিধান, সিভিল সার্ভিসসহ সবকিছু। আমাদের কাজ হলো সব দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা"। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, "কখনো শুনেছেন এমন কমিশনের কথা? তারা সবার সাথে আলোচনা করে ঠিক করবে সব দল কোন সুপারিশগুলো গ্রহণ করবে। এটা কঠিন কাজ যে বাংলাদেশের রাজনীতিক ও দলগুলোর একমত হওয়া"।

'ভোটারের ওপর নির্ভর করছেন না কেন'
প্রশ্নকর্তা এ সময় বলেন, "আমি বলবো রাজনীতিকদের জন্য একমত হওয়া কঠিন। দলগুলো তো বলতে পারে যে এটার মধ্যে গণতান্ত্রিক উপাদান নেই। আপনি ভোটারদের ওপর আস্থা রাখছেন না কেন। যে কোন দলকে ভোট দেয়ার বিষয়ে আস্থা রাখা। সিদ্ধান্তের জন্য ভোটারের ওপর নির্ভর করছেন না কেন। কমিশনের চেয়ে ভোটারের কাছে যাওয়াই তো ভালো আইডিয়া'। জবাবে তিনি বলেন, এমনটা যদি তারা পারতেন তাহলে ভালো হতো, কিন্তু অনেক জটিল বিষয় রয়েছে।

"শেষ পর্যন্ত আপনি কত টাকা দিবেন, আমি ভোট দিবো। টাকা দিবেন, ভোট দিবো। ভোটের বিষয়টি এমন হতে পারে। আমরা সেদিকে যেতে চাই না। ভোটাররা এ বিতর্ক প্রতিদিন দেখছে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সব দলের সম্মতিতে পাওয়া সুপারিশগুলো আলাদা করা এবং এরপর সব দলের সাক্ষরের মাধ্যমে এটি উদযাপন করা। জুলাই চার্টার জাতির কাছে সেটি উপস্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচন হবে," বলেছেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এ কারণেই সংস্কার, সব অপরাধীর বিচার এবং তৃতীয়টি হলো নির্বাচন- এই তিনটি হলো তাদের দায়িত্ব। এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয় "সমালোচকরা বলতে পারে যে কোনো দল চার্টারের সাথে একমত নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ আওয়ামী লীগ। সুতরাং আপনি সত্যিকারভাবে জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত জানানোর কোন সুযোগ দিচ্ছেন না। এটা তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটা ঐকমত্য নয়, এটা আজকের বাংলাদেশে এটা কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ"।

এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, "সেই বিতর্কও আছে। বিতর্ক হলো আওয়ামী লীগ কি একটি রাজনৈতিক দল? তারা কী এভাবে তরুণদের রাস্তায় খুন করতে পারে? এভাবে গুম করতে পারে? এভাবে টাকা চুরি করতে পারে? এখনো কী তাদের রাজনৈতিক দল বলবেন আপনি? এটা কোন জাজমেন্ট নয়, এটা বিতর্ক"।

তিনি বলেন, ইস্যুটি হলো ৫ই অগাস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালালো। জনগণ উৎসব করলো যে তারা এখন মুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ের পর ভেবেছিলাম যে ওই চ্যাপ্টার শেষ । "কিন্তু যারা পালিয়ে গেছে তারা সেটি অব্যাহত রেখেছে। অন্য দেশ থেকে জনগণের উস্কানি দেওয়া, রাস্তায় লড়াই করা। দশ মাস হয়ে গেলো দলটির কেউ এখনো দু:খ প্রকাশ করেনি। বলেনি যে না, আমি এর জন্য দায়ী নই। কারও আদেশে কেউ মারা গেছে। আমি খারাপ বোধ করছি যে আমি এর অংশ ছিলাম। কেউ বলেনি" মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, "রাজপথে তাদের (আওয়ামী লীগ) মিছিল ও অভ্যুত্থানের নেতাদেরসহ হুমকি-ধামকির কারণে আমরা নিরাপদ বোধ করছি না। হুমকি দিচ্ছে অভ্যুত্থানের নেতাদের। তাই জাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে দেশ ও রাজনীতির নিরাপত্তার জন্য একটি সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত। তাদের নিষিদ্ধ করা হয়নি"।

কিন্তু বিচারের বিষয়টি কেন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার কেন এটি করছে-এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এই সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। "যারা আমাদের সরকারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তারা আমাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে। তারা তিনটি দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা সেটি গ্রহণ করেছি। সেজন্যই আমরা এগুলো করছি।" এরপর সংবাদমাধ্যমের ওপর বলপ্রয়োগ বা মিডিয়ার ওপর ক্রাকডাউন চালানো হচ্ছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মি. ইউনূস বলেন, এটি একদম সত্যি নয়। "তারা আর কখনোই এমন স্বাধীনতা ভোগ করেনি"। এই সংলাপে ভারত ও চীনের সাথে তার সরকারের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন আসলেও তিনি দাবি করেছেন, সব সরকারের কাছ থেকেই তিনি সমর্থন পেয়েছেন।

প্রসঙ্গ ভারত ও শেখ মুজিবের বাড়ি
ভারত কোন ক্যাপাসিটিতে সাবেক শেখ হাসিনাকে রাখছে, এমন এক প্রশ্নের জবাবে মি. ইউনূস বলেন, মাসের পর মাস নিষ্ঠুর ঘটনার পর ৫ই অগাস্ট এসেছে। সব ক্ষোভ এখন চলে গেছে ভারতে। কারণ শেখ হাসিনা সেখানে অবস্থান করছেন।

"আমি মোদীকে বলেছি, আপনি তাকে রাখতে চাইলে রাখেন কিন্তু আমাদের সহায়তা করুন তিনি যেন বাংলাদেশী জনগণকে উদ্দেশ্য করে কিছু না বলেন। কারণ তিনি বলছেন আর পুরো বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হচ্ছে। মোদী বলেছেন, এটা সামাজিক মাধ্যম, আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। সেটা এখনো চলেছে"।

মি. ইউনূস বলেন তারা ভারতের সাথে চমৎকার সম্পর্ক গড়তে চান ও ভারতের সাথে কোনো সমস্যা চান না। "কিন্তু কোন একটা বিষয় কাজ করছে না। ভারতীয় প্রেস থেকে ভুয়া সংবাদ আসছে। অনেকে বলেন এর সাথে তাদের নীতিনির্ধারকদের সম্পর্ক আছে। এটা বাংলাদেশকে ক্ষুব্ধ করেছে। আমরা এ থেকে বের হতে পারছি না। যখনই কিছু করার চেষ্টা হয়, তখনোই ক্ষোভ ফিরে আসে," বলছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। একজন প্রশ্নকারী অধ্যাপক ইউনূসের উদ্দেশ্যে বলেন, "৮ই অগাস্ট আপনি বলেছিলেন যে, সবাইকে এক করা আপনার চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ধ্বংস হলো ছয় ঘন্টায় সিটি কর্পোরেশনের বুলডোজার দিয়ে। প্রশাসন নীরব ছিলো। এর ভিত্তিতে আপনি বিভাজন করছেন বা তাদের বাদ দিয়ে আপনি ঐক্য কীভাবে করবেন"? জবাবে তিনি বলেন, তখন অনেক প্রশ্ন ও ইস্যু সব একসাথে এসেছিলো এবং তখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো। তাৎক্ষণিকভাবে তারা সব সামাল দিতে পারেন নি বলে জানান তিনি।

"এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি।এখন পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। শৃঙ্খলা আনাটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ। কারণ, আমরা যে পুলিশ পেয়েছিলাম, কাল যে শিশুদেরকে গুলি করেছে। আজ হঠাৎ করে তারা রাস্তা ফাঁকা করতে বললে, চলে যেতে বললে মানুষ প্রশ্ন করে, 'আপনি কে?' তারা আপনাকে (পুলিশকে) পেটাবে। কারণ তুমি আমার ছেলেকে মেরেছ, তুমি আমার ভাইকে মেরেছ, আমার বোনকে মেরেছ। এখন তুমি আমাকে বলছ আমি কী করব?" প্রধান উপদেষ্টা বলেন পুলিশ রাস্তায় যেতে ভয় পেয়েছে। "আমরা একটা ডেডলক সিচুয়েশনের মধ্যে ছিলাম। আমরা জানতাম না কীভাবে এটাকে সামাল দেব। এখন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসছে। যারা অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো তাদের চিহ্নিত করে বাহিনী থেকে সরানো হয়েছে। এখন পুলিশ আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে," বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা।

পরবর্তী সরকারের অংশ হবেন?
একজন জানতে চান, অধ্যাপক ইউনূস কি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পরবর্তী সরকারের অংশ হতে আগ্রহী বা সে ধরনের অবস্থানে রয়েছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, "কোনোভাবেই না, একেবারেই না। আমি মনে করি, আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের কোনো সদস্য সেটা করতে আগ্রহী হবেন না"। তিনি বলেন, তাঁদের দায়িত্ব হলো যে রূপান্তর চলছে, সেটা ঠিকমতো শেষ করা এবং যখন তাঁরা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তখন জনগণ যেন সন্তুষ্ট থাকে। মি.ইউনূস বলেন, 'আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে নির্বাচনটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।'
সূত্র : বিবিসি

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন