২৪ঘণ্টা অনলাইন : উত্তাল ঢেউ না থাকলেও বিশাল জলরাশি যেন সাগর আকৃতি। অপরূপ সৌন্দর্যের বিশাল আকৃতির এই দিঘীর নাম নীলসাগর। নীলে ভরা না হলেও খোলা আকাশের রঙ মিশিয়ে সেখানে পানির রঙ নীল।
নীলসাগর নীলফামারী জেলা শহরের থেকে উত্তর-পশ্চিমে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার দূরে গোড়গ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত। এই দিঘী ঘিরে রয়েছে অনেক রূপকথার পল্প। আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীর কোনো এক সময় বিরাট রাজা খনন করেছিলেন এটি। রাজার কন্যা বিন্নাবতির নামানুসারে নামকরণ হয় ‘বিন্নাদিঘি’। অনেকের মতে, অষ্টম শতাব্দীতে পা-বরা কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন। বিরাট রাজার এ স্থানটিতে ছদ্মবেশে বসবাস শুরু করেন তারা। সে সময়ে নির্বাসিত পা-বদের পানির চাহিদা মেটাতে দিঘীটি খনন করেছিলেন রাজা। তবে প্রত্নতত্ত্ব সূত্র মতে, এ বিরাট জলাশয়ের কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। লোকে বলে ‘বিন্না রাজার দিঘি’। কিন্তু এই অদ্ভুত নামধারী নৃপতি কে ছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার অনেকে মনে করেন, রাজা বিরাটের ওই স্থানে ছিল গো-গৃহ। বিশাল গরুর পালের পানির সংস্থান করতে ওই সেখানে দিঘীটি খনন করেছিলেন।
এ সমন্ধে সঠিকভাবে কিছু বলা না গেলেও তাদের কথা অসত্য মনে হয় না। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের দিকে আমরা এ দিঘি দেখতে গিয়েছিলাম। দিঘির সারা কাকচর বা বকচর জলজ উদ্ভিদে ভরা ছিল। দক্ষিণ পাড়ের পূর্বভাগে খানকিটা ফাঁকা স্থান দেখে আমি দিঘিতে নেমে দেখলাম যে, সে স্থানটি ছিল ইট বাঁধান এবং তা উভয় দিকে আরও প্রসারিত ছিল। যেখানে নেমেছিলাম সে স্থানের দু’পাশেও অনেকদূর পর্যন্ত কাকচরটি ইট বাঁধান দেখেছিলাম।
২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ স্থান জরিপ করে প্রাথমিকভাবে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে এই দিঘির পূর্ব পাড়ের মাঝামাঝি খনন করে প্রাচীন ইটের নির্মিত ঘাটের উত্তর দিকে একটি বাহু ও মেঝে উন্মোচন করে। যার দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ১০ মিটার এবং প্রস্থ সাড়ে ১৫ মিটার।
১৯৮০ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসন প্রথম সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহন করে। ১৯৯৮ সালে এটিকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। হরেক প্রজাতির গাছপালায় পাখির কিচি-মিচি শব্দে ভরা। রয়েছে পুরো এলাকার পাকা বাউন্ডারি। চারিদিকে পরিভ্রমণে পাকা রাস্তাসহ অতিথিশালা, শিশুদের বিনোদনের সরঞ্জামসহ রয়েছে পিকনিক স্পট।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, নীলসাগর দিঘীটি নীলফামারীর একটি অন্যতম ঐতিহ্য। জনশ্রুতি আছে, রাজা বিরাট তার গরুর পালকে পানি খাওয়ানোর জন্য এই দিঘীটি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে নীলফামারীর নামের সঙ্গে মিউটেশন হয়ে নীলসাগর নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ৫৬ একর জায়গা জুড়ে এই দিঘিটি রয়েছে। অসাধারণ মনোরম দৃশ্যের এই দিঘীটি। নতুন করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলজিইডি থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া জেলা পরিষদ থেকে কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, নীলসাগরকে ঢেলে সাজানোর দীর্ঘমেয়াদী যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হলে এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
