২৪ঘন্টা অনলাইন: নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করে রাজপথে নেমেছে।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ জুলাই কাঠমান্ডুর এক সড়কে যাত্রী অপেক্ষায় ছিলেন ২৫ বছর বয়সী রাইড-শেয়ারিং চালক গণেশ নেপালি। এ সময় নগর পুলিশের সদস্যরা তার মোটরসাইকেলের চাকায় তালা লাগিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গণেশ নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও ১০ জুলাই তিনি মারা যান। এই ঘটনার পর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়।
১২ জুলাই রাজধানীর সিংহদরবার সচিবালয়ের সামনে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাদের হাতে ছিল ‘গরিবের ওপর নির্যাতন বন্ধ কর’ এবং ‘মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাও’ লেখা প্ল্যাকার্ড। বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ গ্রেপ্তার এবং উচ্ছেদ অভিযানের অভিযোগ তোলেন।
বালেন শাহকে ঘিরে বিতর্ক: ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বালেন্দ্র (বালেন) শাহ নগর ব্যবস্থাপনায় কঠোর অবস্থানের জন্য আলোচনায় আসেন। ফুটপাত ও ভাসমান বাজার উচ্ছেদ, নদীতীরের বস্তি অপসারণ এবং নগর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নানা উদ্যোগের কারণে তিনি যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি সমালোচনারও মুখে পড়েছেন।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব অভিযানে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদ কার্যক্রমে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মত: আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠমান্ডু মহানগরীর প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাজু চাপাগাইনের ভাষ্য, পৌর প্রশাসনের কাজ নাগরিকদের সহায়তা করা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা হকার উচ্ছেদ, সম্পত্তি জব্দ এবং নাগরিকদের সঙ্গে বলপ্রয়োগমূলক আচরণ করছে, যা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আইন যা বলছে: নেপালের সংবিধান স্থানীয় সরকারকে নিজস্ব পৌর পুলিশ গঠনের অনুমতি দিলেও তাদের ক্ষমতা সীমিত। ‘কাঠমান্ডু মহানগরী পৌর পুলিশ আইন-২০২৩’ অনুযায়ী, পৌর পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হলো পৌর সম্পত্তি রক্ষা, পার্ক তদারকি, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা।
আইন অনুযায়ী, তাদের লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার বা জনতা নিয়ন্ত্রণের মতো ক্ষমতা নেই।
নেপাল পুলিশের সাবেক ডিআইজি পূর্ণচন্দ্র জোশী বলেন, জননিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত নেপাল পুলিশের সহায়তা নেওয়া। পৌর পুলিশ এককভাবে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, গণেশ নেপালির মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং স্থানীয় প্রশাসনের আচরণ, ক্ষমতার ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। সেই কারণেই আবারও রাজপথে নেমেছে নেপালের তরুণ প্রজন্ম।
