২৪ঘণ্টা অনলাইন : প্রযুক্তি যতই স্বয়ংক্রিয় হোক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেপথ্যে রয়ে গেছে মানুষের বিপুল শ্রম। কম মজুরিতে ডেটা লেবেলিং, কনটেন্ট মডারেশন ও এআই প্রশিক্ষণের কাজ করছেন গ্লোবাল সাউথের বহু কর্মী। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আমরা সাধারণত দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় ও মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রযুক্তি হিসেবে দেখি। একটি নির্দেশ দিলেই তৈরি হচ্ছে লেখা, ছবি, কোড কিংবা অনুবাদ। কিন্তু এই প্রযুক্তির ‘বুদ্ধিমত্তা’র নেপথ্যে রয়েছে বিপুল মানবশ্রম— যার বড় অংশই সাধারণ ব্যবহারকারীদের চোখের আড়ালে।
ছবি ও ভিডিওতে তথ্য যোগ করা, অডিও ট্রান্সক্রাইব করা, বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট শ্রেণিবিন্যাস, ঘৃণাত্মক বক্তব্য শনাক্ত করা কিংবা ক্ষতিকর কনটেন্ট চিহ্নিত করার মতো কাজের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মীরা এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ভূমিকা রাখছেন।
টেলিকম প্যারিসের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও ডিপল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা আন্তোনিও কাসিলি সম্প্রতি এসাদে আয়োজিত এক সেমিনারে এআইয়ের নেপথ্যে থাকা এই ‘অদৃশ্য শ্রম’ নিয়ে আলোচনা করেন। ডিজিটালওয়ার্ক গবেষণা প্রকল্পের সূচনা পর্বের ওই আলোচনায় এআই শিল্পের শ্রমব্যবস্থা, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের নানা দিক উঠে আসে।
এআইয়ের ‘বুদ্ধিমত্তার’ পেছনে মানুষের শ্রম
এআই মডেলকে কার্যকর করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, শ্রেণিবিন্যাস ও লেবেলিং করতে হয়। মেরি এল. গ্রে ও সিদ্ধার্থ সুরি তাদের ২০১৯ সালের বইয়ে এ ধরনের কাজকে ‘ঘোস্ট ওয়ার্ক’ বা অদৃশ্য শ্রম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কাসিলির বক্তব্য অনুযায়ী, একটি আধুনিক এআই ব্যবস্থা কার্যকর করার পেছনে হাজার হাজার ছোট ছোট মানবিক কাজ থাকতে পারে। ছবি ও ভিডিও ট্যাগিং, অডিও ট্রান্সক্রিপশন, কনটেন্ট মডারেশন এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্য শনাক্তকরণ এর মধ্যে অন্যতম। এআইকে কোন কনটেন্ট গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি ক্ষতিকর—তা শেখাতেও মানুষের প্রয়োজন হয়। ফলে এআই সিস্টেম যে ধরনের কনটেন্ট শনাক্ত বা ফিল্টার করবে, অনেক সময় সেই কনটেন্টই আগে মানুষের হাতে পর্যালোচনা করতে হয়।
কিছু কাজের ধরন আরো বিচিত্র। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, এআই-চালিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনারকে ময়লা শনাক্ত করতে শেখানোর জন্য কর্মীদের কুকুরের মলের ছবিও লেবেল করতে হতে পারে। আবার কিছু তথাকথিত স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পেছনেও এমন কর্মী থাকেন, যারা দূরবর্তী স্থান থেকে লাইভ ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য দোকানচুরির বিষয়ে সতর্কবার্তা দেন।
অর্থাৎ, প্রযুক্তি যতটা স্বয়ংক্রিয় বলে মনে হয়, তার কার্যকারিতার পেছনে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে মানবশ্রম।
গ্লোবাল সাউথে কম মজুরির শ্রম
কাসিলির গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের ডিজিটাল কাজের একটি বড় অংশ কেনিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও মাদাগাস্কারের মতো দেশে আউটসোর্স করা হয়। এসব দেশে তুলনামূলক কম মজুরিতে ডিজিটাল কাজ করতে সক্ষম এবং ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়।
অনেক ক্ষেত্রে কাজগুলো ফ্রিল্যান্সার বা গিগ-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে প্রচলিত চাকরির তুলনায় শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সেমিনারে কেনিয়ার এমন কর্মীদের কথাও উঠে আসে, যারা বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করার কাজ করতেন। তাদের পারিশ্রমিক ঘণ্টায় প্রায় ১ দশমিক ৩২ ডলার পর্যন্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
কাসিলির মতে, এআই শিল্পের এই শ্রমব্যবস্থা অনেকটা বৈশ্বিক পোশাক ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পের মতো। সেখানে যেমন উৎপাদনের একটি বড় অংশ কম মজুরির দেশগুলোতে সম্পন্ন হয়, তেমনি এআইয়ের ক্ষেত্রেও শ্রম আহরণের বড় অংশ গ্লোবাল সাউথে হলেও প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেকাংশে কেন্দ্রীভূত থাকে গ্লোবাল নর্থের প্রযুক্তি ও ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে।
ক্ষতিকর কনটেন্টের মানসিক চাপ
এআই প্রশিক্ষণের জন্য কনটেন্ট মডারেশনের কাজ করতে গিয়ে কর্মীদের অনেক সময় সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন, ঘৃণাত্মক বক্তব্য কিংবা অন্যান্য আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়মিত দেখতে হয়।
কাজের ধরনের কারণে এসব কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আলোচনায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সিনিয়র অর্থনীতিবিদ উমা রানী জানান, কিছু কর্মীকে নিয়োগের সময় কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। ডেটা বিশ্লেষক বা অনুবাদক হিসেবে কাজের কথা বলা হলেও পরে তাদের আপত্তিকর কনটেন্ট শ্রেণিবিন্যাসের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
অনেক কর্মীকে গোপনীয়তা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করতে হয়। ফলে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পরিবার বা অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে এই গোপনীয়তা কর্মীদের নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হয়ে অধিকার দাবি করার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারে।
কেনিয়ার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক
এআই শিল্পের অদৃশ্য শ্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও একাধিক অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কেনিয়ায় এআই প্রশিক্ষণের জন্য কনটেন্ট মডারেশনের কাজ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করার কাজে যুক্ত কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে শিশু নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও অন্যান্য ভয়াবহ কনটেন্ট দেখতে হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে কর্মীদের মানসিক চাপ ও কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। এই কাজের পারিশ্রমিক তুলনামূলক কম হওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাজের ধরন, নিয়োগকর্তা, ঠিকাদারি কাঠামো ও পারিশ্রমিকের পরিমাণ আলাদা হতে পারে।
‘স্বয়ংক্রিয়তা’র আড়ালে শ্রম
এআই শিল্পের ক্ষেত্রে বড় একটি প্রশ্ন হলো—কোনো প্রযুক্তিকে কতটা স্বয়ংক্রিয় বলা যায়? কাসিলি এআইয়ের ‘শ্রমের প্রবাহ’ অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, শ্রম আহরণ করা হচ্ছে নাইরোবি বা ম্যানিলার মতো শহরে, অথচ সেই শ্রম থেকে তৈরি অর্থনৈতিক মূল্য কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সিলিকন ভ্যালি, প্যারিস বা বেইজিংয়ের মতো প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে।এতে প্রযুক্তির সুবিধা এবং সেই প্রযুক্তি তৈরির শ্রমমূল্যের মধ্যে একটি বৈশ্বিক অসমতা তৈরি হওয়ার প্রশ্ন সামনে আসে।
করপোরেট কাঠামো ও শ্রমিকের অধিকার
এআই কোম্পানিগুলো অনেক সময় সরাসরি কর্মী নিয়োগের বদলে বাইরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ ধরনের কাজ করিয়ে থাকে। এর ফলে মূল প্রযুক্তি কোম্পানি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং কর্মীর মধ্যে দায়িত্বের একাধিক স্তর তৈরি হয়। শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞদের জন্য এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়—কাজের পরিবেশ, পারিশ্রমিক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শ্রমিকের নিরাপত্তার দায় আসলে কার?
ডিজিটাল শ্রম নিয়ে গবেষণায় শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা, কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে আগাম তথ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।এআই সিস্টেম কীভাবে প্রশিক্ষিত হচ্ছে, কোথায় শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে এবং তাদের কী ধরনের কাজ করতে হচ্ছে—এসব তথ্য আরও স্বচ্ছ করার দাবি উঠছে।
ডিজিটাল শ্রমের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে কাজ করা কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কাসিলির মতে, একটি এআই ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর পেছনে কী ধরনের শ্রম ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানা গেলে সেই প্রযুক্তির সামাজিক ও নৈতিক দিক মূল্যায়ন করা সহজ হয়।
