২৪ঘন্টা অনলাইন: জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা তাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। সে নিজেকেই প্রশ্ন করে—‘আমি এমন আচরণ করলাম কেন? আমার সিদ্ধান্ত কি ভারসাম্যপূর্ণ বিবেচনার ফল ছিল, নাকি প্রবল আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি এমন করেছি?’বাস্তবতা হলো মানুষকে শুধু বুদ্ধি পরিচালনা করে না, আবার শুধু আবেগও পরিচালনা করে না; বরং এ দুটির মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দ্বন্দ্ব কাজ করে।
এদের কোনো একটি প্রাধান্য পেয়ে অন্যটিকে উপেক্ষা করলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর দুটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা লাগানো আছে?’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪) এখানে কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা, যা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ; তার সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে, যা মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধির কেন্দ্র। আসুন, বুদ্ধি ও আবেগ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় চিন্তা করি— মানুষের মধ্যে প্রথম যে বিষয়গুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, তার মধ্যে আবেগ অন্যতম। আবেগের কারণেই মানুষ ভালোবাসে, রাগ করে, ভয় পায় এবং প্রশান্তি অনুভব করে। আবেগই অনেক সময় মানুষকে কোনো কাজ করতে প্রেরণা জোগায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তিনি তাদের হৃদয়গুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আল-আনফাল, আয়াত : ৬৩) মানুষের হৃদয় তার অনুভূতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। নবী ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বুদ্ধির অভাবে ভুল করেনি; বরং তাদের মধ্যে ঈর্ষার আবেগ এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে তা তাদের বিবেচনাবোধকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ তাদের এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতি সম্পর্কে তারা যথাযথভাবে চিন্তা করেনি।
বুদ্ধি হলো পথনির্দেশনা ও বিচার-বিবেচনার দিকনির্দেশক
বুদ্ধি মানুষকে কোনো কাজের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে, লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করতে এবং বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আল্লাহ তাআলা কোরআনের বিভিন্ন স্থানে মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যেমন—‘যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ২)
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ ধরনের আহ্বান এসেছে। কোরআনে বারবার চিন্তা ও উপলব্ধির আহ্বান জানানো প্রমাণ করে যে ইসলাম মানুষকে তার বুদ্ধি নিষ্ক্রিয় রাখতে বলে না; বরং তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করে।
হুদাইবিয়ার সন্ধির ঘটনা লক্ষ করুন—সে সময় সাহাবিদের অনেকের আবেগ যুদ্ধের দিকে ঝুঁকতে পারত; কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বিবেচনার মাধ্যমে সন্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রথম দিকে এ সিদ্ধান্ত কারো কারো কাছে কঠিন মনে হলেও পরবর্তী সময়ে তা ইসলামের জন্য বড় কল্যাণের পথ খুলে দেয়। এ ঘটনা শেখায়, তাত্ক্ষণিক আবেগের পরিবর্তে দূরদর্শী চিন্তা অনেক সময় অধিক কল্যাণকর সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়।
আবেগ একাই নেতৃত্ব দিলে কী হয়?
যখন আবেগ একাই মানুষকে পরিচালনা করে, তখন তার চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়ে যায় এবং সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। অনেক সময় সে সিদ্ধান্তের পরিণতি বিবেচনা করার সুযোগও দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
মুসা (আ.)-এর যৌবনের ঘটনায় দেখা যায়, তিনি একজন নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আঘাতে অপর ব্যক্তি মারা যান। ঘটনাটি তাঁকে নিজের কাজের পরিণতি উপলব্ধি করতে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে উদ্বুদ্ধ করে। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও আবেগের বশে তাড়াহুড়া করে কাজ করলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ঘটতে পারে। তাই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রজ্ঞা ও আত্মসংযমও জরুরি।
আবেগহীন বুদ্ধি মানুষকে কঠোর করে তুলতে পারে
আবেগ ও সহমর্মিতা থেকে বিচ্ছিন্ন বুদ্ধি মানুষকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা হিসাব-নিকাশের দিক থেকে যুক্তিসংগত মনে হলেও মানবিক দিক থেকে কষ্টদায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরপর তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ৭৪)ফেরাউনের কথা চিন্তা করুন। তার মধ্যে পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশ করার ক্ষমতা ছিল; কিন্তু সে দয়া, ন্যায়বোধ ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল। তার অহংকার ও অত্যাচার তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এখানে মূল শিক্ষা হলো বুদ্ধিমত্তা থাকলেই মানুষ ন্যায়পরায়ণ বা মানবিক হয়ে যায় না। বুদ্ধির সঙ্গে নৈতিকতা, দয়া ও আল্লাহভীতির সমন্বয় থাকা জরুরি।
দৃষ্টিভঙ্গিতে হৃদয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামে মানুষের অন্তরের অবস্থা, নিয়ত ও নৈতিক চরিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। বুদ্ধি মানুষকে চিন্তা করতে সাহায্য করে, আর আবেগ তাকে প্রেরণা জোগায়; কিন্তু এগুলোকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে। সেটি সঠিক হলে পুরো শরীর সঠিক হয়, আর সেটি নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়। জেনে রেখো, সেটি হলো হৃদয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২)
হৃদয় পরিশুদ্ধ হলে মানুষের চিন্তা, উদ্দেশ্য ও আচরণে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তখন বুদ্ধি প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করে এবং আবেগ সংযত ও সঠিক পথে পরিচালিত হয়। ইউসুফ (আ.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যখন তাঁকে পাপের দিকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন—‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি!’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ২৩)
তাঁর ঈমান ও আল্লাহভীতি তাঁকে পাপ থেকে রক্ষা করেছিল। তিনি নিজের প্রবৃত্তি ও আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি; বরং সত্য ও ন্যায়ের পথকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এভাবেই ঈমানদার হৃদয় মানুষের চিন্তা ও আবেগকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।পরিশেষে মানুষ তখনই সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারে না, যখন শুধু আবেগ তাকে পরিচালনা করে; আবার কেবল বুদ্ধির ওপর নির্ভর করেও পূর্ণ ভারসাম্য অর্জন করা যায় না; বরং যখন হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে, তখন বুদ্ধি প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করে এবং আবেগ সচেতনতার সঙ্গে পরিচালিত হয়।বুদ্ধি আমাদের পথ দেখায়, আবেগ আমাদের শক্তি জোগায়, আর ঈমানদার ও পরিশুদ্ধ হৃদয় আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
