২৪ঘণ্টা অনলাইন : ঢাকার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক ব্যতিক্রমী অভিভাবক সভা। অনাড়ম্বর এই আয়োজনে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দূরত্ব ঘুচিয়ে নতুন এক সংহতির মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। সভার বড় চমক ছিল অধ্যক্ষের ঘোষণা, এখন থেকে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের পর তা দেখার জন্য শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অভিভাবকদের বাসায় পাঠানো হবে। তাতেই অডিটোরিয়াম করতালিত মুখর হয়ে ওঠে এবং অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিমেষেই উবে গেছে। নতুন এক সংহতির জয়োগানে উদ্বীপ্ত হয়েছে পুরো আয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ-পরিকল্পনায় এগিয়ে যাবে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স এই স্বপ্ন-আবহে শেষ আয়োজন।
ঘোষণা দিয়েই সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ১৭ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন ধাপে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে এই সভা। প্রথম ধাপে দশম শ্রেণি, এরপর অষ্টম ও নবম এবং সর্বশেষ দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অভিভাবকদের নিয়ে পৃথক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার মেবেল কস্তা, আরএনডিএম আন্তরিকতার সাথে অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমি পথ চলতে পারব না। আমরা মানুষ আমাদের ভুল হতে পারে। আপনারা আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন। আমরা চাই শিক্ষক-অভিভাবক মিলে ছাত্রীদের মেধা বিকাশে কাজ করতে। ভাবতে হবে কি করলে আমাদের মেয়েদের আরো ভালো রেজাল্ট হবে। তাই আমি আপনাদের সাথে ঘনঘন মিটিং করতে চাই। আপনাদের সাথে কথা বলতে চাই। পরামর্শ পেতে চাই।’
সিস্টার মেবেল শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কোনো শিক্ষার্থীর সাথে অন্য কারো তুলনা করা ঠিক নয়। কেউ ভালো করবে; কেউ খারাপ করতে পারে। তবে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি পক্ষপাত করা হয় না। প্রয়োজনে আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন মেয়ে কিভাবে ভালো রেজাল্ট কিভাবে করতে পারে। মনে রাখবেন কোনো শিক্ষার্থী খারাপ করলে আমাদেরও আপনাদের মতো কষ্ট হয়।’

অভিভাবক সভায় শিক্ষক প্রতিনিধি জুলিয়ানা শেফালী গমেজ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আমাদের অধ্যক্ষ খুবই আন্তরিক মানুষ। তার সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে কথা বলা যাবে। সকলের জন্য তার দরজা উন্মুক্ত।’
অভিভাবক প্রতিনিধি সঞ্জয় প্রাসাদী বলেন, বর্তমান অধ্যক্ষ এই স্কুলকে ঢাকার অন্যতম ১০টির মধ্যে একটি বিদ্যালয় করার জন্য অবিরাম চেষ্টা করছেন। আসুন, আমরা তাকে সর্বোতভাবে সহায়তা করি। এর আগে অনেক প্রিন্সিপালের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সব মিলিয়ে তাকে আলাদা মনে হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্তে খুব দৃঢ় হলেও একজন আদর্শিক এবং মানবিক মানুষ। আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে বর্তমান প্রিন্সিপালের ভালো কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই।

অভিভাবক আরিফ সোহেল বলেন, এই বিদ্যালয়ের পরিবেশ পড়ানোর সিস্টেম, কারিকুলাম সবমিলিয়ে যথেষ্ট মান সম্পন্ন। এই স্কুল থেকে পাশ করে আমার বড় মেয়ে ডাক্তারি পড়ছে। নতুন অধ্যক্ষ আসার পর সেই পরিবেশ আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। এটা আমার ছোট মেয়ের মুখের কথা। আমার ছোট মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী। ওকে নিয়ে আমি বড় কিছু আশা করছি। তবে কিছু অসঙ্গতি এখনো রয়ে গেছে। ডায়েরিতে ক্লাসে কি পড়ানো হয়, পরের দিন কি পড়া আছে তা পূর্ণাঙ্গভাবে লিখে দেওয়া প্রয়োজন। সব শাখায় একই সিলেবাস অনুযায়ী পড়ানো উচিত। পরীক্ষায় কোন কোন অনুচ্ছেদ থাকছে তা শুরুতেই নির্ধারণ করে দিতে হবে। স্কুলের বেতন অন্যান্য ফি ব্যাংকিং এবং অনলাইনের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপর অভিভাবক ড. রাজিয়া সুলতানা বলেন, আমরা যেমন পরিবার-জীবন-সংসংসার পচিালনায় পরিকল্পনা মাফিক আগাই। ঠিক সেভাবে আমাদের সন্তানদের শিক্ষা নিয়েও প্লান করতে হবে। আর শিক্ষা হচ্ছে সৃজনশীল মাধ্যম। এই পরিকল্পনা অনেকটা ক্রিভুজের মতো। যেখানে আমরা তিন পক্ষ ডড়িয়ে। সেখানে সবার আগে অভিভাবক, আছেন শিক্ষক এবং সর্বোপরি আমাদের শিক্ষার্থী সন্তান। আমরা যদি এই ট্রাই এঙ্গেলের অর্থাৎ ক্রিভুজের মতো সবার কাজ ঠিক মতো করি; তা হলে অবশ্যই ভালো রেজাল্ট আশা করা যায়।’
সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন থিওটোনিয়াস রিন্টু গমেজ। শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম, আফরিনা হক, লিটন কুমার সাহা, মুজাহিদুল ইসলাম, শাহ আলম, আফসানা নিখিল, আজিজুল নাহার, কল্লোল রিবেরু, লিন্ডা সম্পা গমেজ, ধীরাজ ভাস্কর নাথ, তন্বী চাকমা, শ্যামল কর্মকার, প্রদীপ খান ও দীপক ভৌমিক প্রমুখ।
উল্লেখ্য, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাংলাদেশের প্রাচীনতম এবং নামকরা নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শতাব্দী পুরনো একটি প্রতিষ্ঠান। বছর হিসেবে ১১৪-তে পা দিয়েছে। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত এবং ক্যাথলিক মিশনারি দ্বারা পরিচালিত। এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯১২ সালে 'কংগ্রেগেশন অফ আওয়ার লেডি অফ মিশনস' [আরএনডিএম] নামক ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী সংঘ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সততা, সেবা এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করা। প্রতিবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় এই প্রতিষ্ঠানের পাসের হার প্রায় শতভাগ এবং গৌরবজনক।
