অয়ন্তিকা সাহা
পোস্টবক্স বা চিঠির বাক্স কমবেশি সকলেরই চেনা। সব দেশে চিঠির বাক্সের কাজ এক হলেও, রঙ কিন্তু এক নয়। এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে চমৎকার ইতিহাস। বিভিন্ন দেশের পোস্টবক্সের আলাদা রঙ আসলে যুদ্ধ, ইতিহাস এবং ট্র্যাফিক সুরক্ষার গল্প বলে।
ভারতের লাল ডাকবাক্সের নেপথ্য কাহিনী
ভারতে লাল রঙের পোস্টবক্স দেখা যায়। ব্রিটিশরা যখন ভারতে প্রথম এই পিলারের মতো বাক্স চালু করে, তখন সেগুলি কিন্তু লাল রঙের ছিল না। প্রথম দিকে এই চিঠির বাক্সগুলোর রঙ ছিল সবুজ। কিন্তু সবুজ রঙ হওয়ায় এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। চারপাশের গাছপালা এবং ঝোপঝাড়ের সঙ্গে এই সবুজ বাক্সগুলো পুরোপুরি মিশে যেত। এর ফলে সাধারণ মানুষ বাক্সগুলো খেয়াল না করে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যেতেন।
ব্রিটেন সরকার ১৮৭৪ সালে তাদের চিঠির বাক্সের রঙ বদলে উজ্জ্বল লাল করে দেয়। লাল রঙ খুব দূর থেকেও সহজে চোখে পড়ে। ব্রিটেনকে দেখে ভারতও তখন থেকে লাল রঙের পোস্টবক্স ব্যবহার করা শুরু করে। ভারতে সাধারণত চিঠির জন্য লাল বাক্স ব্যবহার করা হলেও আরও বিভিন্ন রঙের পোস্টবক্স দেখা যায়। স্থানীয় বা লোকাল চিঠির জন্য সবুজ রঙের বাক্স এবং মেট্রো সিটির চিঠির জন্য নীল রঙের বাক্স ব্যবহার করা হয়। এর ফলে চিঠি দ্রুত আলাদা করতে সুবিধা হয়। তবে এই সবুজ ও নীল বাক্স এখন খুব কমই দেখা যায়।
চিনের সবুজ পোস্টবক্সের ঐতিহ্য
অধিকাংশ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ লাল রঙের বাক্স রাখলেও চিন সম্পূর্ণ উল্টো পথ বেছে নেয়। তারা তাদের পোস্টবক্সের জন্য সবুজ রঙ বেছে নিয়েছিল। চিনে কিং সাম্রাজ্য যখন আধুনিক ডাক পরিষেবা চালু করে, তখন সবুজ রঙকে অফিশিয়াল ব্র্যান্ডের রঙ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
চিনে পিপলস রিপাবলিক গঠিত হওয়ার পরেও সরকার এই সবুজ রঙটি বজায় রাখে। কারণ সেখানে সবুজ রঙকে শান্তি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক বলে মনে করা হয়। পরবর্তীকালে এটি চিনে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালে হংকং যখন চিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন ব্রিটিশ আমলের লাল বাক্সগুলোকে চিনের প্রতীক হিসেবে সবুজ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমেরিকার সিদ্ধান্ত ও লাল রঙের নিষেধাজ্ঞা
১৯০০ সালের শুরুর দিকে আমেরিকার পোস্টবক্সগুলো লাল বা গাঢ় সবুজ রঙের হতো। কিন্তু ১৯০৯ সালে আমেরিকার সরকার লাল রঙের বক্সের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কারণ সে দেশের ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ বা আগুন নেভানোর জলের কলগুলো লাল রঙের ছিল। সে দেশের সরকার আশঙ্কা করেছিল, যে জরুরি অবস্থায় মানুষ লাল চিঠির বাক্সকে ভুল করে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ভেবে বসতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের কাছে বেঁচে যাওয়া প্রচুর পরিমাণে ‘অলিভ ড্র্যাব’ বা সবুজ রং ডাক বিভাগকে দান করে দেয়। বিনামূল্যে এই রং পাওয়ার কারণে আমেরিকার পোস্টবক্সগুলো পরবর্তী বেশ কয়েক দশক ধরে সবুজ রঙেরই থেকে গিয়েছিল।
অবশেষে ১৯৭১ সালে যখন আমেরিকার ডাক বিভাগ নাম বদলে উইএসপিএ নামে পথ চলা শুরু করে, তখন তারা একটি বড় পরিবর্তন আনে। তারা তাদের দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে পোস্টবক্সের রঙ বদলে আবার গাঢ় নীল করে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমেরিকায় এই নীল রঙের চিঠির বাক্সই দেখা যায়।
সূত্র : এই সময়
