শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

জিডিপির ১%-এ স্বাস্থ্য বিপ্লব? অর্থনীতিবিদরা যা বলতেন

প্রকাশিত - ১৯ জুন, ২০২৬   ০৯:২১ পিএম
webnews24

২৪ঘন্টা অনলাইন : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি অর্থনৈতিক রম্য-বিশ্লেষণ
সংখ্যাটা শুনতে দুর্দান্ত: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা — গতবারের চেয়ে প্রায় ৯৬% বেশি। সরকার বলছে, এটা স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ। কিন্তু সংখ্যাটা যত বড়, তার পেছনের শতকরা হিসাবটা তত ছোট: জিডিপির মোটে ১%। অ্যাডাম স্মিথ আজ থাকলে নির্ঘাত কপাল কুঁচকে বলতেন, "ইনভিজিবল হ্যান্ড স্বাস্থ্যখাতে চলে না, ভাই — এটা পাবলিক গুড, বাজার একা সামলাবে না, আর সরকারও যদি অর্ধেক মনে হাত বাড়ায়, তাহলে হাতই অদৃশ্য থেকে যায়।"

কেইনস হলে অন্য প্রশ্ন তুলতেন — টাকা ঢালা হচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট কাজ করে তখনই, যখন প্রতিটি টাকা ঘুরে অর্থনীতিতে কাজ তৈরি করে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সেই টাকার একটা বড় অংশ "লিকেজ" হয়ে যায় — কেনাকাটায় দুর্নীতি, প্রকল্প বিলম্ব, আর হাসপাতালের সেই পুরনো রোগ: বরাদ্দ আসে, কিন্তু ডাক্তার আসেন না। কেইনস হাসতে হাসতে বলতেন, "তোমাদের মাল্টিপ্লায়ার তো গুণ না করে ভাগ করে দিচ্ছে।"

অমর্ত্য সেনের কাছে প্রশ্নটা আরও গভীর। তাঁর ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ বলে— টাকা বাড়ানো লক্ষ্য নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোই লক্ষ্য। বাংলাদেশে এখনও স্বাস্থ্যসেবার খরচের সিংহভাগ মানুষ নিজের পকেট থেকে দেয় — এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বরাদ্দ দ্বিগুণ হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি আজও ওষুধের টাকা জোগাড় করতে জমি বিক্রি করে, তাহলে সেন বলবেন— "বাজেট বেড়েছে, সক্ষমতা নয়।"

অভিজিত ব্যানার্জি ও এস্থার দুফলোর মতো আধুনিক অর্থনীতিবিদরা হয়তো সরাসরি প্রশ্ন করতেন — "টাকাটা কোথায় ঢালছ, সেটা প্রমাণ দিয়ে বলো।" এভিডেন্স-বেসড পলিসির জায়গায় বাংলাদেশের বাজেট প্রক্রিয়া এখনও অনেকটাই "অনুমানভিত্তিক জনপ্রিয়তা।" RCT-চিন্তার অর্থনীতিবিদরা বলতেন, প্রথমে পাইলট করো, কোন হাসপাতালে বিনিয়োগ আসলে রোগী বাঁচায়, সেটা মেপে দেখো — তারপর পুরো দেশে ছড়াও। নইলে বরাদ্দ বাড়ানো আর অন্ধকারে ঢিল মারা একই কথা।

আর জেমস বুকাননের পাবলিক চয়েস থিওরি? সেটা সবচেয়ে নির্দয় প্রশ্ন তোলে — এই বরাদ্দ কি নাগরিকের প্রয়োজনে, নাকি নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের রাজনৈতিক হিসাবে? জিডিপির ৫%-এ পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতির প্রথম কিস্তি হিসেবে এই বাজেট নিঃসন্দেহে একটা সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু বুকানান মনে করিয়ে দিতেন— রাজনীতিবিদের প্রণোদনা হলো হেডলাইন বানানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি নয়। দুটো একসাথে হলে ভালো; না হলে সংখ্যাটা থেকে যায় কাগজে, হাসপাতালের বেডে নয়।

শেষ কথা: বরাদ্দ দ্বিগুণ হওয়া সুসংবাদ, কিন্তু ক্লাসিক্যাল থেকে আধুনিক — সব অর্থনীতিবিদই একমত হতেন একটা জায়গায়— সংখ্যা বাড়লে উদযাপন করা যায়, কিন্তু ফলাফল না দেখে উদযাপন শেষ করা ঠিক না। জিডিপির ৫% পর্যন্ত পথ অনেক বাকি, আর সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা টাকার অভাব নয়— ব্যবস্থাপনার অভাব।

 

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন