শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

গন্ধগোকুলের ভিডিও এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের ভণ্ডামি

প্রকাশিত - ২৯ জুন, ২০২৬   ০৮:৩৭ পিএম
webnews24

২৪ঘন্টা অনলাইন : সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কার এক শিশু ধানক্ষেতের আইল ধরে হাঁটছে। তার কাঁধে একটি গন্ধগোকুল, পেছনে পেছনে হাঁটছে একটি সজারু। দৃশ্যটি অসংখ্য মানুষকে আবেগাপ্লুত করেছে। ভিডিওটির নিচে হাজার হাজার মন্তব্য "প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অপূর্ব সম্পর্ক", "এমন জীবনই সত্যিকারের সুন্দর", "প্রকৃতির কোলে ফিরে যেতে চাই"।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসি? নাকি ভালোবাসি কেবল প্রকৃতির রোমান্টিক ছবি, ভিডিও এবং তাকে ঘিরে নির্মিত আবেগকে?

বাংলাদেশের বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। আন্তর্জাতিক বন পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে দেশে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর বনভূমি হারিয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, শালবন ও উপকূলীয় বনাঞ্চল ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। একই সময়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের শত শত নদী ও খাল দখল, দূষণ এবং নাব্যতা সংকটের কারণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। একসময় যে খাল-বিল ও জলাশয় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, তার অনেকগুলোই আজ আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা কিংবা বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অন্তত ৩১টি প্রাণী প্রজাতি ইতোমধ্যে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩৯০টি প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও পাখি শিকার, বন্যপ্রাণী হত্যা কিংবা প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংসের ঘটনা অহরহ ঘটছে। গ্রামে সাপ, শেয়াল, গন্ধগোকুল কিংবা বনবিড়াল দেখলেই অনেক সময় মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলে; কারণ আমরা তাদের সহাবস্থানের অংশ হিসেবে নয়, বরং অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই দেখি।

এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা নিজেদের প্রকৃতিপ্রেমী বলে ভাবতে ভালোবাসি, অথচ আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আমরা সামাজিক মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের ছবি পোস্ট করি, কিন্তু বাড়ির সামনে গাছ কাটার সময় নীরব থাকি। আমরা গন্ধগোকুলের ভিডিও দেখে আবেগে ভাসি, কিন্তু সেই গন্ধগোকুলের বেঁচে থাকার বনটুকু রক্ষার প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকি।

সত্যটা হলো, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসি না; আমরা ভালোবাসি প্রকৃতির নস্টালজিয়া, তার নান্দনিক উপস্থাপনাকে। বাস্তব প্রকৃতি যার জন্য ত্যাগ, দায়িত্ব এবং প্রতিরোধ প্রয়োজন সেই প্রকৃতির প্রতি আমাদের আগ্রহ খুবই সীমিত।

শ্রীলঙ্কার সেই শিশুর ভিডিও তাই কেবল একটি ভাইরাল দৃশ্য নয়; এটি আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় আমরা কী দেখি? প্রকৃতিপ্রেমী এক জাতিকে, নাকি আত্মপ্রবঞ্চনায় অভ্যস্ত এক সমাজকে?

আমরা কি প্রকৃতিকে ভালোবাসি, নাকি কেবল তার ভিডিওকে? আমরা কি প্রকৃতির পাশে আছি, নাকি তার ধ্বংসযজ্ঞের নীরব সহযোগী? আর আমাদের সন্তানরা যখন বইয়ের পাতায় গন্ধগোকুল, সজারু কিংবা শেয়ালের ছবি দেখে জানতে চাইবে "এরা কোথায় থাকে?" তখন আমরা তাদের কী উত্তর দেব?

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন