শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

ইজারা প্রথার অবসান : সুযোগ, সংকট ও সম্ভাবনা

প্রকাশিত - ০৫ জুলাই, ২০২৬   ০৮:০১ পিএম
webnews24

২৪ঘন্টা অনলাইন : সরকার দেশের উন্মুক্ত জলাশয় থেকে ইজারা প্রথা তুলে দিয়ে প্রকৃত জেলেদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। ‘জল যার, জাল তার’এই নীতিকে সামনে রেখে নেওয়া সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, সরকারি জলাশয়ের বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়; প্রকৃত জেলেরা সেখানে শ্রম দিলেও লাভের বড় অংশ ভোগ করতেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। সরকারের এই উদ্যোগ সেই বৈষম্য কমানোর একটি সাহসী প্রচেষ্টা। 

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য বড়। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ, আর এই খাত গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পুষ্টি নিরাপত্তার একটি প্রধান ভিত্তি। প্রকৃত জেলেরা যদি মধ্যস্বত্বভোগীর পরিবর্তে সরাসরি জলাশয়ে প্রবেশাধিকার পান, তাহলে তাদের আয় বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে ইজারা বাবদ সরকারের যে রাজস্ব আসত, তার বিকল্প কী হবে? সেই ঘাটতি পূরণে সরকার কি কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বা লাইসেন্সিং পদ্ধতি চালু করবে?

সামাজিকভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে পারে। জলাশয় শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি স্থানীয় প্রভাব ও ক্ষমতারও উৎস। ফলে ইজারা বাতিলের মাধ্যমে বহু পুরোনো স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব কমতে পারে। কিন্তু বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো, "প্রকৃত জেলে" নির্ধারণ করা। স্বচ্ছ নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকলে নতুন ধরনের দখলদার বা ভুয়া জেলে গোষ্ঠী তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাজনৈতিক দিক থেকেও সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের একটি বার্তা বহন করে। তবে নীতির সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে। অতীতে বিভিন্ন নীতির মতো যদি স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্বল তদারকি এই উদ্যোগকে প্রভাবিত করে, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি পরিবেশগত। উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার কখনোই নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশাধিকার হতে পারে না। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের জাতীয় মৎস্য নীতিতেও প্রকৃত জেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অভয়াশ্রম, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

তাই ইজারা প্রথা বাতিলকে কোনো চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের ডিজিটাল নিবন্ধন, কমিউনিটি-ভিত্তিক জলাশয় ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পোনা অবমুক্তকরণ, প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি এবং অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ইজারা থাকবে কি থাকবে না এতটুকু নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জলাশয়ের মালিকানা কি কাগজে বদলাবে, নাকি সত্যিই জেলেদের জীবনে পরিবর্তন আনবে? যদি রাষ্ট্র সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করতে পারে, তবে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মৎস্য খাতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সংস্কার হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় শুধু ইজারাদার বদলাবে, কিন্তু জলাশয় ও জেলেদের ভাগ্য খুব বেশি বদলাবে না।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন