এক
ঢাকা কোনো নিচু জলাভূমিতে গড়ে ওঠা দুর্ভাগা শহর নয়। বরং উল্টো — এটি এমন এক জনপদ, যাকে প্রকৃতি নিজের হাতে পানির সাথে বসবাসের জন্য তৈরি করে দিয়েছিল। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহরকে ঘিরে আছে তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা — একাধিক নদী, আর বুড়িগঙ্গা নিজেই তার পানির প্রায় সবটা পায় তুরাগ থেকে। এই নদীগুলোর সাথে শহরের ভেতরের সংযোগ ঘটাত অসংখ্য খাল, যেগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি নিজের ঢালেই নেমে যেত নদীতে — কোনো পাম্প ছাড়াই, শুধু মাধ্যাকর্ষণের নিয়মে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় "গ্র্যাভিটি ড্রেনেজ", আর এটাই ছিল ঢাকার আসল, প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে— যে শহরের গড়নই পানি সরিয়ে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিল, সেই শহর আজ কেন সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানিতে ডোবে? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে।
দুই: যখন ঢাকা ছিল জলের শহর
১৬০৮ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান ঢাকাকে রাজধানী করার পর নগর-পরিকল্পনার প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বুড়িগঙ্গা থেকে একটি কৃত্রিম খাল কাটান, যা পরে পরিচিতি পায় "ধোলাই খাল" নামে। এই খাল বালু নদীকে বুড়িগঙ্গার সাথে যুক্ত করত এবং শহরের বর্জ্য ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। মুঘল আমলের এই পরিকল্পনা প্রমাণ করে, ঢাকা শুরু থেকেই পানি-ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, পানির বিরুদ্ধে লড়াই করে নয়।
ব্রিটিশ আমলে ঢাকার আয়তন ছিল আজকের তুলনায় অনেক ছোট — উত্তরে শাহবাগ, দক্ষিণে চর ইউসুফ ও চরকামরাঙ্গী, পশ্চিমে ধানমন্ডি এবং পূর্বে মতিঝিল-ইংলিশ রোড পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এই এলাকাতেই ছিল প্রায় ১২০টি পুকুর। নদী গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা ও তার আশপাশ মিলিয়ে এক সময় ছিল প্রায় ১৫টি নদী ও ৭৫টি খাল। এই জলাধারগুলো শুধু পরিবহনের কাজেই লাগত না, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও নিষ্কাশনের কাজেও তাদের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য।
তিন: সংকটের সূচনা — পরিসংখ্যানে একটি ধ্বংসের ইতিহাস
১৯৫৯ সালে প্রণীত ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনায় শহরের আয়তন ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৩০ বর্গকিলোমিটার, যা তখনকার জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট প্রশস্ত বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষত আশির দশক থেকে শুরু হওয়া দ্রুত নগরায়ণের ঢেউয়ে সেই পরিকল্পনা ভেসে যায়। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অভিবাসন বাড়তে থাকে, আর জমির চাহিদা মেটাতে একে একে ভরাট হতে থাকে খাল, পুকুর, নিচু জলাভূমি।
সংখ্যাগুলো নিজেই কথা বলে। এক সময়কার ৬৫টি প্রাকৃতিক খালের মধ্যে ২০০৮ সালের এক জরিপে দেখা যায়, টিকে আছে মাত্র ৪৪টি, যার মধ্যে ৩৫টি ইতিমধ্যে প্রায় শুকিয়ে গেছে। আজ কাগজে-কলমে ২৬টি খালের অস্তিত্ব দেখানো হলেও, বাস্তবে তার প্রায় সবগুলোই দখল-ভরাটে বিপর্যস্ত, নদীর সাথে সংযোগহীন। বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে একসময় থাকা ২২৭টি সংযোগ খালের অস্তিত্ব আজ আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ আমলের ঢাকায় থাকা ১২০টি পুকুরের জায়গায় আজ টিকে আছে মাত্র চব্বিশটি।
এই ধ্বংসযজ্ঞের গতি সবচেয়ে বেশি তীব্র হয় নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজারের প্রথম দশকে, যখন ঢাকা এক কোটির বেশি জনসংখ্যার মেগাসিটিতে পরিণত হয়— কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল না কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান, ছিল না প্রয়োগযোগ্য জলাধার সংরক্ষণ আইন। ফলে যে জমি একসময় বৃষ্টির পানি শুষে নিত, সেখানে গড়ে ওঠে আবাসন প্রকল্প, মার্কেট, রাস্তা। শহরের ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৩৩০ বর্গকিলোমিটারই আজ দালানকোঠায় ঢাকা, যেখানে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলাও এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত ঢাকার প্রধান খাল ও নর্দমার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল ঢাকা ওয়াসা, আর শাখা লাইনের দায়িত্বে ছিল সিটি করপোরেশন। এই দ্বৈত দায়িত্বের সুযোগে দুই সংস্থা একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে দশকের পর দশক পার করেছে। ২০২০ সালে খালগুলোর দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত হলেও, তার পরের বছরগুলোতেও দখলমুক্তি ও সংস্কারের অগ্রগতি ছিল হতাশাজনকভাবে ধীর।
চার: আজকের বাস্তবতা
ফলাফল আমরা প্রতি বর্ষায় দেখি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, মৌচাক, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার, মতিঝিল, পুরান ঢাকার সড়ক-অলিগলি তলিয়ে যায়— যা প্রমাণ করে সংকট এখনো কোনোভাবেই সমাধান হয়নি, বরং প্রতিবছর নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
অথচ প্রকৌশলগত সক্ষমতার অভাব নেই। কমলাপুর সংলগ্ন পাম্পস্টেশন দিয়ে মিনিটে সাড়ে আট লাখ লিটার পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা থাকলেও, তার পুরোটা কাজে লাগে না— কারণ পাম্প পর্যন্ত পানি পৌঁছানোর নালা-নর্দমাই ভরাট ও অচল। এখানেই সংকটের আসল চরিত্র উন্মোচিত হয়— এটি প্রযুক্তির অভাব নয়, এটি ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
পাঁচ: সমাধানের পথ কোথায়
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও তুলনামূলক অভিজ্ঞতা মিলিয়ে সমাধানের রূপরেখা মোটামুটি স্পষ্ট, যদিও তার বাস্তবায়ন কঠিন:
খাল ও জলাধার উদ্ধার একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত। চারটি প্রধান নদীর সাথে অন্তত ছাব্বিশটি অবশিষ্ট খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন করা গেলে শহরের বড় অংশের পানি প্রাকৃতিক উপায়েই বেরিয়ে যেতে পারবে, কৃত্রিম পাম্পের ওপর নির্ভরতা কমবে।
সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান দরকার, যেখানে খাল, নর্দমা নেটওয়ার্ক, ভূমির উচ্চতা-নিম্নতা এবং পানিপ্রবাহের দিক বৈজ্ঞানিকভাবে একটি কাঠামোর আওতায় আসবে— বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে।
একক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা জরুরি। ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক— একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন সমন্বয়হীনতা তৈরি করে, যার মাশুল দেয় নগরবাসী। একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার প্রয়োজন, যেহেতু প্রতিদিন উৎপাদিত ছয় হাজারের বেশি টন গৃহস্থালি বর্জ্যের একটি বড় অংশ প্লাস্টিকসহ নালায় গিয়ে জমা হয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও সমান জরুরি।
বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ভাবা দরকার— রিটেনশন পন্ড ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি নগর এলাকার সীমিত জায়গার মধ্যেও অতিরিক্ত পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষত যেখানে খাল পুনরুদ্ধার তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়।
কিছুটা আশার কথা হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য দশ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার একাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন ও খাল পুনরুদ্ধারে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার ইতিহাস বলে, বরাদ্দ কখনোই একমাত্র সমস্যা ছিল না— অতীতেও শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তবু দুর্ভোগ কমেনি। আসল প্রশ্ন তাই অর্থের নয়, দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের ইচ্ছাশক্তির।
ছয়: শেষ কথা
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি একটি নদীবেষ্টিত, স্বভাবত জলনিষ্কাশন-বান্ধব শহরকে চার শতাধিক বছরের পরিকল্পিত অবহেলায় নিজের হাতে অকেজো করে তোলার গল্প। মুঘল আমলের শাসকরা যে দূরদর্শিতা নিয়ে খাল কেটেছিলেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা তার সিকিভাগও ধরে রাখতে পারেনি। বৃষ্টি প্রতিবছর আসবে, প্রকৃতির নিয়মেই— প্রশ্ন হলো, আমরা তাকে আবার সেই পুরনো পথ ফিরিয়ে দেব, নাকি প্রতিবছর নতুন করে ডুবতে থাকব একই অভিযোগ আর একই প্রতিশ্রুতির চক্রে।
