শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অমূল্য নসিহত

প্রকাশিত - ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬   ১০:১৬ পিএম
webnews24

২৪ ঘণ্টা অনলাইন : নতুন শিক্ষাবর্ষ মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন যাত্রা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে যায়, শ্রেণিকক্ষ মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। আর ইসলামে জ্ঞানের মর্যাদা কতটা গভীর, তা বোঝার জন্য প্রথম ওহির কথা স্বরণ করাই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১) অর্থাৎ ইসলামের সূচনাই হয়েছে জ্ঞানের আহ্বান দিয়ে। কারণ জ্ঞান মানুষকে শুধু পৃথিবী সম্পর্কে জানায় না; বরং তাকে তার স্রষ্টাকে চিনতে, নিজের দায়িত্ব বুঝতে এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে।জ্ঞান যখন ঈমান ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা মানুষকে আলোকিত করে। আর জ্ঞান যদি নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে তা কখনো কখনো মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণও হতে পারে। 

শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষ তৈরি করা : শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু একজন শিক্ষার্থী ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা কর্মকর্তা হলো কি না—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সে কেমন মানুষ হলো, তার জ্ঞান সমাজের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনল এবং সে তার দায়িত্ব কতটা সততার সঙ্গে পালন করল—সেটিই শিক্ষার বড় পরিচয়। একজন শিক্ষিত মানুষ যদি জ্ঞানী হয় কিন্তু অন্যায় থেকে বিরত না থাকে, মানুষের অধিকার রক্ষা না করে এবং নৈতিকতার মূল্য না বোঝে, তাহলে তার শিক্ষা পূর্ণতা পায়নি। তাই প্রকৃত শিক্ষা হলো—মস্তিষ্কে জ্ঞানের আলো এবং হৃদয়ে নৈতিকতার আলো জ্বালানো। 

শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, মানুষ গড়েন : একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করা নয়। তাঁর একটি কথা, একটি পরামর্শ, একটি আচরণ কিংবা একটি স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিই কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের দিকে পথনির্দেশ করে, সে তা সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পাবে। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৭০) এ কারণে একজন আদর্শ শিক্ষক একই সঙ্গে জ্ঞানদাতা, পথপ্রদর্শক ও চরিত্র নির্মাতা। তাঁর প্রভাব শ্রেণিকক্ষের সীমানা ছাড়িয়ে বহু বছর পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর জীবনে থেকে যেতে পারে।

আজকের একজন শিক্ষার্থী আগামী দিনের চিকিৎসক হয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, প্রকৌশলী হয়ে দেশের অবকাঠামো গড়তে পারে, বিজ্ঞানী হয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে কিংবা একজন সৎ কর্মকর্তা হয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। তার পেছনে একজন শিক্ষকের একটি ছোট্ট পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

শিক্ষকের আচরণই শিক্ষার্থীর নীরব পাঠ : শিশু-কিশোরদের ওপর কথার চেয়ে কাজের প্রভাব অনেক বেশি। শিক্ষক যদি সময়নিষ্ঠ হন, শিক্ষার্থীরা সময়ের মূল্য শেখে। তিনি যদি সত্যবাদী হন, শিক্ষার্থীরা সত্যবাদিতা শিখে। তিনি যদি ধৈর্যশীল ও বিনয়ী হন, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই গুণ বিকশিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে বিষয়ে নম্রতা থাকে, তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যে বিষয় থেকে নম্রতা সরিয়ে নেওয়া হয়, তা তাকে কলঙ্কিত করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৪) তাই শিক্ষকের জ্ঞান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর চরিত্রও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক নিজের আচরণের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের সামনে একটি জীবন্ত পাঠ্যবই হয়ে ওঠেন।

শিক্ষককে সম্মান করা মানে জ্ঞানকে সম্মান করা :  ইসলামী ঐতিহ্যে শিক্ষক ও আলেমদের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের সঙ্গে বিনয়, সৌজন্য ও শ্রদ্ধার আচরণ করবে—এটাই জ্ঞান অর্জনের অন্যতম আদব। শিক্ষকের সম্মান মানে অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং তাঁর জ্ঞান, শ্রম ও শিক্ষাদানের মর্যাদা উপলব্ধি করা। যে শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শেখে, সে মূলত জ্ঞানের মর্যাদা উপলব্ধি করতে শেখে।

বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা জরুরি : শিক্ষাজীবনে সঙ্গীর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ভালো বন্ধু একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় উৎসাহিত করে, তার লক্ষ্যকে শক্তিশালী করে এবং ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে। বিপরীতে খারাপ সঙ্গ সময় নষ্ট করতে পারে, সংকল্প দুর্বল করে দিতে পারে এবং মানুষকে তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৫৩৪) তাই একজন শিক্ষার্থীর জন্য বই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বন্ধু নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনে অন্তরায় নয় : বর্তমান যুগে প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করেছে। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের অসংখ্য বই, গবেষণা, বক্তৃতা ও শিক্ষামূলক উপকরণ মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার একই সঙ্গে সময় নষ্ট, বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্যের উৎসও হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা।

কোনো তথ্য দেখলেই বিশ্বাস করা যাবে না। তথ্যের উৎস যাচাই করতে হবে, সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করতে হবে এবং উপকারী জ্ঞান ও বিভ্রান্তিকর তথ্য আলাদা করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৬)

একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয়। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বের আসনে বসবে। তাই তাদের হাতে শুধু বই তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের হাতে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষাও তুলে দিতে হবে। শিক্ষকদের হতে হবে আদর্শের প্রতীক, শিক্ষার্থীদের হতে হবে জ্ঞানপিপাসু ও চরিত্রবান, অভিভাবকদের হতে হবে সহযোগী এবং সমাজকে হতে হবে শিক্ষাবান্ধব। একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে—বিভ্রান্তির উৎস হিসেবে নয়। কারণ প্রকৃত শিক্ষা সেই শিক্ষা, যা মানুষের মস্তিষ্ককে আলোকিত করে, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং তার জ্ঞানকে মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করে।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন