২৪ঘণ্টা অনলাইন : গিবত ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি গুনাহ। মানুষের অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে বা অসন্তুষ্ট হবে—সেটিই গিবত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা অপছন্দ করো।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২) আয়াতটি গিবতের ভয়াবহতা বোঝাতে এমন এক উপমা দিয়েছে, যা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। জীবিত অবস্থায় যার সম্মান রক্ষা করা উচিত, তার অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা করা যেন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার মতো ঘৃণ্য কাজ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও গিবতের সংজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দিয়েছেন। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি জানো গিবত কী?’ সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি যা বলছি তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবে তুমি তার গিবত করলে; আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
তবে অনেক সময় সামাজিক জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন কোনো বৈধ প্রয়োজন পূরণে কারও সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানানো জরুরি হয়ে পড়ে। ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, অধিকার সংরক্ষণ ও ক্ষতি প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই শরিয়তসম্মত কিছু প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে কারও অনুপস্থিতিতে তার কোনো দোষ প্রকাশ করা অনুমতি রয়েছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত জরুরিও বটে।
তাই কারো দোষ সত্য হলেও তার অনুপস্থিতিতে তা আলোচনা করা গিবত হতে পারে।
তবে শরিয়ত মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, অধিকার সংরক্ষণ এবং ক্ষতি প্রতিরোধের বিষয়টি বিবেচনা করে কিছু ব্যতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে।
১. জুলুমের অভিযোগ জানানো
কেউ যদি অন্যায়ের শিকার হয়, তাহলে নিজের ওপর সংঘটিত জুলুমের কথা এমন ব্যক্তির কাছে জানাতে পারে, যিনি সেই জুলুম দূর করার ক্ষমতা রাখেন। যেমন—কেউ কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, পাওনা পরিশোধ করছে না, অধিকার নষ্ট করেছে অথবা অন্য কোনোভাবে জুলুম করেছে। এ অবস্থায় বিচারক, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে অভিযোগ করা গিবত হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এখানে উদ্দেশ্য কারো সম্মানহানি করা নয়; বরং অন্যায় বন্ধ করা এবং নিজের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়া উদ্দেশ্য।
২. অন্যায় বন্ধ করতে সহযোগিতা চাওয়া
কেউ যদি প্রকাশ্যে কোনো অন্যায় করে এবং তাকে থামানোর জন্য এমন কোনো ব্যক্তির সাহায্য প্রয়োজন হয়, যিনি তা বন্ধ করতে পারেন, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী তার কাছে বিষয়টি জানানো জায়েজ। যেমন বলা হলো, ‘অমুক ব্যক্তি এই অন্যায় করছে; আপনি তাকে তা থেকে বিরত রাখুন।’ এখানে মূল উদ্দেশ্য হতে হবে অন্যায় প্রতিহত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।
৩. শরিয়তের বিধান জানার জন্য প্রশ্ন করা
কোনো ব্যক্তি নিজের কোনো সমস্যার শরিয়তি সমাধান জানতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো দোষ বা অন্যায়ের কথা আলেম, মুফতি বা শরিয়তের জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে বলতে পারে। যেমন কোনো নারী তার স্বামীর কোনো আচরণের ব্যাপারে শরিয়তের বিধান জানতে চান। অথবা কেউ কোনো আত্মীয়ের অন্যায় আচরণ সম্পর্কে জানতে চান—এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য আলেমকে জানানো বৈধ। এক্ষেত্রে সম্ভব হলে ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করাই উত্তম। তবে যদি সঠিক মাসআলা জানার জন্য পরিচয় বা নির্দিষ্ট ঘটনা বলা অপরিহার্য হয়, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা বলা যেতে পারে।
৪. কাউকে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে সতর্ক করা
কখনো কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না জানালে অন্য একজন মানুষ বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো গিবত হিসেবে গণ্য হবে না। উদাহরণস্বরুপ, কেউ যদি বিয়ের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে পরামর্শ চায়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এমন কোনো গুরুতর দোষ জানা থাকলে, যা ভবিষ্যৎ দাম্পত্যজীবনে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা গোপন করা উচিত নয়।
একইভাবে ব্যবসায়িক অংশীদার নির্বাচন, গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন, আমানত রাখা কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কেউ পরামর্শ চাইলে তার ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো যেতে পারে। তবে এখানে প্রয়োজনীয় সত্য তথ্য জানানোই উদ্দেশ্য হতে হবে।
হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাই এবং সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাবি বা সাক্ষীর প্রয়োজনীয় দুর্বলতা উল্লেখ করার অনুমতি রয়েছে। বরং দ্বীন ও ন্যায়বিচার রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের সমালোচনা কখনো অপরিহার্যও হতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর দ্বিন ও মহানবী (সা.)-এর হাদিসকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা। তাই কোনো ব্যক্তি যদি এমন কারও কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করতে থাকে, যার কারণে তার আকিদা, আমল বা চিন্তাধারায় গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সতর্কতা প্রদান করা যেতে পারে।
৫. প্রকাশ্য গুনাহের ক্ষেত্রে
কেউ যদি কোনো গুনাহ বা অন্যায় কাজ প্রকাশ্যেই করে এবং তা গোপন করার চেষ্টা না করে, তাহলে তার প্রকাশ্য সেই কাজের ব্যাপারে প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে এবং মানুষকে তার থেকে সতর্ক করা প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই প্রকাশ্য অন্যায়ের কথা বলা যেতে পারে।
৬. পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজন হলে
কখনো কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য তার কোনো পরিচিত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা প্রয়োজন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে যদি অপমানের উদ্দেশ্য না থাকে এবং অন্য কোনো উপায়ে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা গিবতের মধ্যে পড়বে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বাকে গিবত, অপবাদ ও অনর্থক আলোচনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন। সূত্র : রিয়াদুস সালেহিন, ইমাম নববী (রহ.) ও তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, মুফতি তাকি উসমানী।
