শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

খলিফা আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ

প্রকাশিত - ০২ অক্টোবর, ২০২৬   ০১:৩১ এএম
webnews24

২৪ঘণ্টা অনলাইন : মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা.) যখন মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর প্রথম দিকের বক্তব্যেই ফুটে ওঠে শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের ওপর আমার শাসনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। সুতরাং আমি সঠিক পথে চললে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে। আর আমি ভুল পথে চললে তোমরা আমাকে সংশোধন করে দেবে।’
কী অসাধারণ বিনয়! সাধারণত ক্ষমতার আসনে বসার পর মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চায়।

কিন্তু আবু বকর (রা.) দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই জনগণকে জানিয়ে দিলেন—নেতৃত্ব মানে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং দায়িত্ব পালন এবং জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া। তিনি জনগণকে অন্ধ আনুগত্যের শিক্ষা দেননি; বরং সঠিক কাজে সহযোগিতা এবং ভুল হলে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন।
এরপর তিনি বলেন, ‘সত্য ও সততা হলো আমানত, আর মিথ্যা হলো খেয়ানত।’ অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি হতে হবে সত্য ও বিশ্বস্ততার ওপর।

কোনো ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোক, তার দায়িত্বে মিথ্যা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার স্থান নেই। একইভাবে সাধারণ মানুষের জীবনেও সত্যবাদিতা ও আমানতদারি ইসলামী চরিত্রের অপরিহার্য অংশ।
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আবু বকর (রা.)-এর অবস্থান ছিল আরও সুস্পষ্ট। তিনি ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে দুর্বল, সে আমার কাছে শক্তিশালী—যতক্ষণ না আমি আল্লাহর ইচ্ছায় তার প্রাপ্য অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিই। আর তোমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী, সে আমার কাছে দুর্বল—যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে অন্যের হক উদ্ধার করে দিই।

’ অর্থাৎ ইসলামী শাসনব্যবস্থায় শক্তিশালী হওয়ার অর্থ অধিকারের মালিক হয়ে যাওয়া নয়; বরং অন্যের অধিকার হরণ করলে সেই শক্তিই তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর দুর্বল হওয়ার অর্থ অধিকার হারিয়ে ফেলা নয়; বরং তার অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে। সমাজে কারো অর্থ-সম্পদ, বংশ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব তাকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। অন্যদিকে যে ব্যক্তি দুর্বল, অসহায় কিংবা অধিকার আদায়ে অক্ষম—তার দুর্বলতাই তাকে অবহেলার কারণ হতে পারে না। বরং তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই শাসকের দায়িত্ব।

আবু বকর (রা.) শুধু ব্যক্তিগত চরিত্র ও ন্যায়বিচারের কথা বলেননি; সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ করা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন। আর যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদের ওপর মহামারি বা বিপদাপদ ব্যাপক করে দেন।’ এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতির আত্মিক ও নৈতিক অবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। একটি সমাজ যখন আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার পথ থেকে দূরে সরে যায় এবং পাপাচার ও অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার সামাজিক ও নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবশেষে আবু বকর (রা.) তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমার আনুগত্য করো, যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করি। কিন্তু যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হই, তাহলে আমার আনুগত্যের কোনো অবকাশ নেই।’ অর্থাৎ শাসকের আনুগত্য নিঃশর্ত নয়; বরং তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন নেতা যত বড় পদেই থাকুন না কেন, তিনি সত্য ও ন্যায়ের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর দায়িত্ব হলো আল্লাহর বিধান ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অধীন থেকে মানুষের অধিকার রক্ষা করা।

আজকের সমাজেও এই বক্তব্যের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—নেতৃত্ব মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং মানুষের অধিকার রক্ষা করা। ক্ষমতা মানে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা নয়; বরং জবাবদিহির বোঝা বহন করা। আর আনুগত্য মানে অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়; বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে সহযোগিতা করা।

হজরত আবু বকর (রা.)-এর ভাষণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বে শাসক ও জনগণ উভয়েই দায়িত্বশীল। শাসক ভুল করলে তাকে সংশোধন করতে হবে, আর জনগণও সত্য ও ন্যায়ের পথে তাকে সহযোগিতা করবে। এভাবেই একটি সমাজে আস্থা, ন্যায় ও শান্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র : মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২০৭০; ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৬৭; ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ২/৬৬০–৬৬১; তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৩/২১০।
 

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন