ড. রাজিয়া সুলতানা : কেবল অস্ট্রেলিয়ায় ক্যারিয়ার নয়, সারা বিশ্বের যেকোন দেশেই একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য বইটি অপরিহার্য। এমন কি বাংলাদেশের চাকরি প্রত্যাশিদের জন্যও বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লেখক এম মাহমুদুল হাসান ২০০৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়াতে অবস্থান করছেন। একজন সফল মানুষ হিসেবে অসংখ্য মানুষকে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করায় বইটির এমন নামকরণ করেছেন। তবে বাঙালিরা যে কোনো দেশে গিয়েই প্রায় একই সমস্যায় সমস্যায় পড়ে। এই বইটি তাদের সেই সমস্যা থেকে উত্তরণে সহায়তা করবে। এটি কেবল মোটিভেশনালমূলক বই নয়; লেখক বাস্তবিক অভিজ্ঞতার সাথে প্রকৃত তথ্য মিলিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন— যা ক্যারিয়ার সচেতনদের জন্য হয়ে উঠবে সোনার খনি।
লেখক দেখিয়েছেন, অভিবাসন পলিসির সমর্থক অনেক দেশই অভিবাসীদের সাথে যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না অনেক কারণে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চাকরিদাতাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন অভিবাসী। তবে অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্মন্নদের বিশেষত্ব ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তারাও যথাস্থানে যেতে পারছেন না। লেখক দেখিয়েছেন এজন্য কীভাবে ও কী ধরনের অতিরিক্ত কোর্স বা ট্রেনিং করতে হবে। স্থানীয় অভিজ্ঞতা কীভাবে খুঁজে বের করতে হবে। কিছু বিষয় জানা থাকলে একজন অভিবাসী দুই দিনেও চাকরি পেয়ে যেতে পারেন নইলে লেগে যেতে পারে দুই বছরও। লেখক স্পষ্ট করেই দেখিয়েছেন, অভিবাসী হিসেবে দক্ষতা ও অভিজ্ঞার গ্যাপে আপনি কোথায় আছেন? আপনি কোথায় নিজেকে দেখতে চান? অনেক ছোটো-খাটো বিষয়ও তিনি শিখিয়েছেন। যেমন এজন্য জানতে হবে কীভাবে সিভি প্রস্তুত করতে হয় কিংবা কীভাবে কাভার লেটার লিখতে হয়? অনেক আবেদনকারীর সিভি, কাভার লেটার, ইন্টারভিউ কল পেতে কাজ করে না। একটা চাকরির জন্য কীভাবে লিঙ্কডইনের মাধ্যমে কাজের অনুসন্ধান, সিভি, কাভার লেটার, ফলোআপ, রেফারেন্স চেক একে অপরের সাথে সংযুক্ত তা দেখিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বজুড়ে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির এই সময়টি হতে পারে, একজন অভিবাসীর পছন্দের জায়গায় চাকরি পাওয়ার একটি উপযুক্ত সময়। চাকরি খোঁজা একটি প্রক্রিয়া। এটিকে খুব গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। একটি সচেতন প্রচেষ্টার সাথে সুখের একটি সম্পর্ক থাকে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এমন অনেক বিষয়কে লেখক সামনে এনেছেন। আপনার সমস্ত সংস্থান, নেটওয়ার্ক, সরঞ্জাম, পোর্টাল ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কঠিন পরিকল্পনা দিয়ে কীভাবে শুরু করবেন? কীভাবে একটি জীবনবৃত্তান্ত চাকরির বিজ্ঞাপনের সাথে মানানসই করে তৈরি করতে হবে। কীভাবে প্রশ্ন করা হয় এবং কীভাবে উত্তর দিতে হবে তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কীভাবে নেটওয়ার্কিং শুরু করবেন তা নিয়ে। অনেকেই অন্যের সাথে কথা বলার টপিকস খুঁজে পান না। কীভাবে কথা বলতে হবে এবং টপিকস খুঁজে পাবেন সে পথেরই দিশা দিয়েছেন লেখক।
‘অস্ট্রেলিয়ায় ক্যারিয়ার’ বইটির ১১টি চ্যাপ্টার হলো—১. অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি খোঁজা, ২. মেনটরিং, ক্যারিয়ার পরামর্শদাতা ওক্যারিয়ার প্ল্যান, ৩. আপনি কোন কোর্সটি করবেন? ৪. অস্ট্রেলিয়ার চাকরির জন্য ডকুমেনটসমূহ, ৫. অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি চাকরির সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া, ৬. ইন্টারভিউ, ৭. আপনার ঙ্কিডইন প্রোফাই, ৮. ইমেইল ও বিজনেস শিষ্টাচার এবং প্রেজেনেটশন দক্ষতা, ৯. চাকরি সংক্রান্ত কিছু উপদেশ, ১০. অস্ট্রেলিয়ায় কিছু চাকরির ক্ষেত্র এবং ১১. কিছু অভিজ্ঞতা [চাকরিতে আবেদন থেকে প্রাপ্তি পর্যন্ত]
প্রতিটি চ্যাপ্টারের অনেকগুলো করে বিষয় আলাদা আলাদা শিরোনামে লেখা হয়েছে। কোনো বাহুল্য নেই, একদমই ঠাসবুননে লেখা। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করায় এবং বিভিন্ন উদাহরণ দেয়ায় বইটি আরও প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বা অন্য দেশে পড়াশোনা, চাকরি বা স্থায়ীভাবে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেন যাঁরা— এই বই তাঁদের জন্য একটি বাস্তবমুখী পথনির্দেশিকা। মাহমুদুল হাসান দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, চাকরি-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ এবং অস্ট্রেলীয় কর্মসংস্কৃতির বাস্তব চিত্র একত্র করে বইটি সাজিয়েছেন। বইটিতে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হতে আগ্রহী একজন নতুন অভিবাসীর জরুরি প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়।
প্রথম অধ্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার জব মার্কেট, আবেদন কৌশল ও রিক্রুটারদের আচরণ নিয়ে সরল ও প্রয়োগযোগ্য পরামর্শ রয়েছে। নতুনদের জন্য এটি দিকনির্দেশনার মতো কাজ করে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মেন্টর খুঁজে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার রোডম্যাপ তৈরির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রবাসজীবনে সঠিক নির্দেশক পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখানে স্পষ্ট। তৃতীয় অধ্যায়ে পড়াশোনা ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাজারচাহিদার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোন কোর্সে বাস্তব চাকরির সুযোগ বেশি, লেখক সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। রিজিউমে, কভার লেটার, সার্টিফিকেশন, ভিসা–সবকিছু নিয়ে চতুর্থ অধ্যায়টি অত্যন্ত কার্যকর। অস্ট্রেলীয় মান অনুযায়ী ডকুমেন্ট তৈরি করার স্পষ্ট ধারণা দেয়।
পঞ্চম অধ্যায়টি উল্লেখযোগ্য, কারণ অস্ট্রেলিয়ার পাবলিক সার্ভিসে সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া পূরণ করা তুলনামূলক কঠিন। লেখক উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে দক্ষতাকে প্রমাণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হয়। তিনি চাকরি প্রার্থীদের জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ টিপসও দিয়েছেন। ছয় নম্বর অধ্যায়ে ইন্টারভিউ প্রশ্ন, বিভিন্ন পদ্ধতি, আচরণগত মূল্যায়ন—সবই বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সাক্ষাৎকারে প্রায়শই আসে এমন ৫০টি নমুনা প্রশ্নও দেয়া হয়েছে। ডিজিটাল যুগে লিংকডইন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উপস্থাপন করা হয়েছে প্রোফাইল গঠন, নেটওয়ার্কিং কৌশল ও রিক্রুটারদের নজরে আসার উপায়। এই অধ্যায়ে পেশাদার ইমেইল টোন, প্রেজেন্টেশন দক্ষতা এবং অস্ট্রেলিয়ার কর্পোরেট কালচারের আচরণবিধি সংক্ষেপে ও কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
নবম অধ্যায়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা দূর করা, হতাশা সামলানো ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির গুরুত্ব এখানে তুলে ধরা হয়েছে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী সতর্কতাও রয়েছে। পরের অধ্যায়ে টেক, হেলথ, কনস্ট্রাকশন, এডুকেশন, রিটেইলসহ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান চাকরির সেক্টরগুলোর একটি পরিচিতিমূলক সারসংক্ষেপ পাওয়া যায়। বাজারমুখী সিদ্ধান্ত নিতে এটি সহায়ক। শেষ অধ্যায়ে লেখক নিজের এবং অন্যান্য অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা যুক্ত করেছেন—যা নতুন পাঠকদের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো।
তথ্যগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা। অস্ট্রেলীয় জব মার্কেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরামর্শ। নতুনদের জন্য সহজ, ব্যবহারযোগ্য ভাষা। বিভিন্ন ধাপ—চাকরি খোঁজা, প্রস্তুতি, নেটওয়ার্কিং, ইন্টারভিউ—ধারাবাহিকভাবে সাজানো। ‘অস্ট্রেলিয়ায় ক্যারিয়ার’ এক ধরনের প্র্যাকটিক্যাল গাইডবুক—যারা অস্ট্রেলিয়ায় নতুন, যারা চাকরির জন্য কাঠামোগত প্রস্তুতি নিতে চান অথবা দীর্ঘদিনেও সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এটি দিকনির্দেশনামূলক ও অনুপ্রেরণাদায়ক গ্রন্থ। বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ ও সহজপাঠ্য উপস্থাপনা বইটিকে বিশেষভাবে মূল্যবান করেছে।
১৮৪ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে ঝুমঝুমি প্রকাশন। মূল্য ৫৬০ টাকা। ব্রত রায়ের প্রচ্ছদটিও যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
