শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

রমজানে প্রয়োজন শরিয়তসম্মত সচেতনতা

প্রকাশিত - ০১ মার্চ, ২০২৬   ১১:০৬ পিএম
webnews24

২৪ঘণ্টা  অনলাইন  :  রমজান এলে মুসলিম সমাজে ইবাদতের আবহ তৈরি হয়। মসজিদে তারাবি, সাহরি-ইফতারের আয়োজন, দান-সদকা—সব মিলিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ। এ সময় অনেকেই জাকাত আদায় করেন। এটি প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হলো—আমরা কি কেবল আবেগে জাকাত দিচ্ছি, নাকি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সচেতনভাবে আদায় করছি?

জাকাত ইসলামের একটি মৌলিক ফরজ। এটি দান নয়, অনুগ্রহ নয়; বরং আল্লাহর নির্ধারিত হক। কোরআনে বারবার সালাতের সঙ্গে জাকাতের কথা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,  “তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩)

অন্য আয়াতে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে— “যারা সোনা-রূপা সঞ্চয় করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৪)

অতএব জাকাত বিলম্ব করা, অবহেলা করা বা ভুলভাবে আদায় করাকে হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়।

আবেগের সমস্যা কোথায়?

রমজানে সওয়াব বেশি; এ কথা সত্য। তবে অনেকে সারা বছর হিসাব না করে রমজানের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে জাকাত দেন।
এতে কয়েকটি সমস্যা দেখা যায়—
•    নিসাব ও হাওলের তথা সম্পদের পরিমাণ ও সময়ের সঠিক হিসাব হয় না
•    প্রাপকের যোগ্যতা যাচাই করা হয় না
•    কখনো ফিতরা ও জাকাত গুলিয়ে ফেলা হয়
•    প্রকৃত হকদার বঞ্চিত থেকে যায়
জাকাতের নির্দিষ্ট প্রাপক নির্ধারণ করে দিয়েছেন আল্লাহ নিজেই। তিনি বলেছেন- “নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) হলো দরিদ্র, মিসকিন, জাকাত-সংগ্রাহক, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরের জন্য।” (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)
এ আয়াত প্রমাণ করে, জাকাত বণ্টনও ইবাদতের অংশ। কেবল আবেগে যাকে-তাকে দিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
সচেতনতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

১. সঠিক হিসাব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন তোমার কাছে দুইশ’ দিরহাম থাকবে এবং এক বছর পূর্ণ হবে, তখন তাতে পাঁচ দিরহাম জাকাত।
” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭৩)  এ থেকে বোঝা যায়, নিসাব ও এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত। তাই ব্যাংক সঞ্চয়, ব্যবসার পুঁজি, সোনা-রূপা—সব মিলিয়ে হিসাব করতে হবে। কেবল ধারণা নয়, নির্ভুল গণনা জরুরি।

২. নিয়ত ও ইখলাস

জাকাত লোকদেখানো বা সামাজিক সম্মান অর্জনের উপায় নয়। আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা দান করে খোঁটা দিয়ে বা কষ্ট দিয়ে তোমাদের সদকা নষ্ট করো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৪)  অর্থাৎ জাকাতের আধ্যাত্মিক মূল্য নির্ভর করে নিয়তের ওপর।

৩. প্রাপকের মর্যাদা রক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কারও কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন।” (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯) জাকাত এমনভাবে দেওয়া উচিত, যাতে প্রাপকের সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে। ছবি তুলে প্রচার করা বা অপমানজনক আচরণ করা ইবাদতের চেতনার পরিপন্থী।

৪. জাকাত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

জাকাত কেবল ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য। আল্লাহ বলেন, “যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।” (সুরা হাশর, আয়াত : ৭) এ আয়াত জাকাতের সামাজিক দর্শন স্পষ্ট করে—সম্পদের সুষম বণ্টন।

রমজান কি বাধ্যতামূলক সময়?

অনেকে মনে করেন, জাকাত শুধু রমজানেই দিতে হবে। আসলে জাকাত ফরজ হয় সম্পদে এক বছর পূর্ণ হলে। রমজানে দিলে সওয়াব বেশি হতে পারে, কিন্তু ফরজ হওয়ার সময় বিলম্ব করা উচিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি বিষয়ের ওপর… তার একটি হলো জাকাত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮) এটি ইসলামের স্তম্ভ। স্তম্ভকে আবেগ দিয়ে নয়, দৃঢ়তা ও সচেতনতা দিয়ে ধারণ করতে হয়।

রমজান আমাদের হৃদয় নরম করে, দানের আগ্রহ বাড়ায়—এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত। কিন্তু জাকাত কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি হিসাব, দায়িত্ব এবং তাকওয়ার বিষয়।

সচেতনভাবে নিসাব নির্ধারণ, সঠিক প্রাপক নির্বাচন, নির্ভুল পরিমাণ আদায় এবং আন্তরিক নিয়ত—এই চারটি দিক নিশ্চিত করতে পারলেই জাকাত হবে পূর্ণাঙ্গ ইবাদত। রমজানের আবেগকে যদি জ্ঞান ও সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবেই জাকাত হবে আত্মশুদ্ধি, সম্পদের পবিত্রতা এবং সমাজের কল্যাণের শক্তিশালী মাধ্যম।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

 

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন