১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘হোয়াইটওয়ে লেইডল’। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন ঢাকাকে নানা রঙে সাজিয়ে পুরো ভারতবর্ষে এক আকর্ষণীয় শহরে পরিণত করার মূল সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। তিনি এই ‘হোয়াইটওয়ে লেইডল’ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে হকি স্টিক দেখে নবাববাড়ির তরুণদের জন্য কিনে আনেন। ঘটনাটি ১৯০৭-০৮ সালের। আর এভাবেই ঢাকায় হকি খেলার শুভসূচনা ঘটে। আজ প্রায় ১১৯ বছর ধরে ঢাকায় হকি খেলা চলে আসছে।
১৮৯৫ সালে ভারতে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে পুরনো হকি টুর্নামেন্ট ‘বেইটন কাপ’ শুরু হয়েছিল— যা ঢাকায় হকি শুরুর মাত্র ১২ বছর আগের ঘটনা। স্যার জর্জ থমাস ডুরান্ট বেইটন নামের এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা ১৯০৫ সালে নিজের নামে এই টুর্নামেন্টটি চালুর উদ্যোগ নেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ টুর্নামেন্ট ১২৬ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অবশ্য আমাদের দেশে ভালো কোনো কিছু চালু হলেও তা বেশি দিন টিকে থাকে না। এই যেমন দেখুন না, আগা খান গোল্ড কাপ কত সহজেই না বন্ধ হয়ে গেল! যাক, ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ কী? মূল প্রসঙ্গে অর্থাৎ হকিতেই ফিরি।
হকি খেলা প্রথম কোথায় চালু হয়েছিল? ভারতে নয়, ১৮ শতকে ইংল্যান্ডে আধুনিক হকির প্রবর্তন হয়। তবে প্রাচীন ইতিহাসের চারণভূমি হলো মিশর। সেখানে গিজার তিনটি মূল পিরামিড ছাড়াও ছোট-বড় বহু পিরামিড ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো এমনই এক সমাধিসৌধে (টম্ব) হকি স্টিক এবং কাঠ ছেঁচে বানানো গোল আকৃতির বলের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
আমাদের এই উপমহাদেশ একসময় বিশ্ব হকিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ১৯২৮, ১৯৩২ এবং ১৯৩৬ সালের অলিম্পিকে টানা সোনা জেতে তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া। আর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন মেজর ধ্যানচাঁদ। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের ফাইনালে স্বয়ং হিটলারের উপস্থিতিতে জার্মানিকে ৮-১ গোলে হারিয়েছিল ধ্যানচাঁদের দল। খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণের সময় ধ্যানচাঁদকে জার্মানির নাগরিকত্ব এবং সেদেশের সেনাবাহিনীতে উচ্চপদের প্রস্তাব দেন হিটলার, যা ধ্যানচাঁদ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।
এর আগে ১৯৩৩ সালে 'ঝাঁসি হিরোজ' দলের হয়ে কলকাতায় বেইটন কাপ জিতেছিলেন ধ্যানচাঁদ। এরপর ১৯৪০ সালে তিনি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক আরমানিটোলা মাঠে। এছাড়া ঢাকা একাদশের বিরুদ্ধেও তিনি ম্যাচ খেলেছিলেন।
হকি খেলার জন্য যে ধরনের শারীরিক গঠন প্রয়োজন, তা আমাদের তরুণদের রয়েছে। তবে আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় পিছিয়ে পড়ার কারণ হলো অর্থের লালসা। পাকিস্তান আমলে ঢাকা স্টেডিয়ামে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, অথচ তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানের কোথাও দোকানসহ স্টেডিয়াম ছিল না। ব্যস, যা হওয়ার তা-ই হলো! পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ যা চেয়েছিল, সেটাই সফল হলো। এখন আমাদের সব স্টেডিয়ামেই দোকানের দাপট।
একসময় পল্টন ময়দানে সভা-সমাবেশ হতো, অফিসফেরত মানুষ খোলা হাওয়ায় সেখানে একটু জিরিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরত। কিন্তু এক ফুঁয়ে যেন সেই সবকিছু উড়িয়ে দেওয়া হলো। স্টেডিয়াম বানিয়ে নাম দেওয়া হলো ‘হকি স্টেডিয়াম’। অথচ হকি মাঠের আয়তনের সাথে গ্যালারির কাঠামোর কোনো বাস্তব সামঞ্জস্য নেই। পশ্চিম দিকের গ্যালারি মাঠ থেকে এত দূরে যে, সেখানে বসে সাধারণ দর্শকরা হকির ছোট বলটি দেখতেই পাবেন না। তবে হাঁ, মাঠ বড় করে বানানোর ফলে দোকানের সংখ্যা বেড়েছে, সাথে পাওয়া যাচ্ছে মোটা অঙ্কের ভাড়া আর সেলামি। আমাদের কর্তৃপক্ষের তো এটাই আসল দরকার!
মাঠ তো অধিকাংশ সময় খালিই পড়ে থাকে। আর ভিআইপি বক্সে যে কয়েকজন কাজ ফেলে খেলা দেখতে আসেন, তাদের আপ্যায়নের জন্য চা-সিঙাড়ার ব্যবস্থাই তো কাফি!
কী ভাবছেন? কবে আমরা বিশ্বমানে পৌঁছাব? আন্তর্জাতিক মান তো দূরের কথা, আগে অন্তত কলকাতার মানে পৌঁছানোর জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর নিয়মিত ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করুন। কোনো বাহিনীর প্রধানকে সভাপতি না বানিয়ে একজন সাবেক হকি খেলোয়াড়কে ক্লাবের বা ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট করুন।
নইলে সেই ‘ফিগার ৮’ (Figure 8)-এর চক্রেই আটকে থাকবেন। এই আট আকৃতির বৃত্তে হাঁটতে থাকলে কোনো শেষ খুঁজে পাবেন না; এক জায়গায় দাঁড়িয়েই শুধু ঘুরপাক খেতে হবে, সামনে এগোনো আর হবে না।
কর্নেল রিয়াজ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি নতুন কমিটি গঠিত হলো, অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়—তাকে কোথাও রাখা হলো না! বিশিষ্ট হকি ব্যক্তিত্ব ও সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়ার কর্নেল ফেরদৌসও উপেক্ষিত হলেন। এমনকি দেশের অন্যতম সেরা হকি দল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনো প্রতিনিধিকেই এই কমিটিতে রাখা হয়নি। আর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, সেনাবাহিনী থেকেও এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই।
আমাদের অবস্থা এখন যেন সেই—
রাম-লক্ষণ সীতা হরণ,
রাবণ বধের পালা।
গ্রাম-গঞ্জে এই পালাগান আজও প্রচলিত। রামায়ণের সেই পালায় রাবণপুত্র মেঘনাদ যেমন প্রমোদাগারে নয় মাস একটানা ঘুমিয়ে থাকত, আমাদের ক্রীড়া প্রশাসকদের ঘুমও কি তবে সেই সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হলো? উত্তর কেবল আল্লাহই জানেন!
