► মেজর চাকলাদার (অব.)
দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ হকি দলের অধিনায়ক হয়েও শেষ পর্যন্ত আমার যাওয়া হয়নি। সেবার হকির সভাপতি মেজর জেনারেল মতিন আমাকে তাঁর অফিসে ডাকলেন। আমি গেলাম। তিনি জানালেন, সিজিএস মেজর জেনারেল সামাদ আমার সঙ্গে কথা বলবেন।
কল এল, স্পিকার অন করা। মেজর জেনারেল সামাদ মতিন স্যারকে বললেন, "আপনি আর চাকলাদার এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেন না। আপনি কমান্ড্যান্ট হিসেবে আর চাকলাদার স্টুডেন্ট হিসেবে এসআইএনটি-তে (SINT) যাবেন।"
মেজর জেনারেল সামাদ এবং জেনারেল মতিনের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামাদ সাহেব মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন (রিপ্যাট্রিয়েট), আর জেনারেল মতিন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে 'বীর প্রতীক' খেতাব অর্জন করেছিলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তার মধ্যে মানসিকতার আকাশ-পাতাল তফাত থাকাটাই স্বাভাবিক। জেনারেল মতিনের হকির সাফল্য মানেই ছিল সেনাবাহিনীর সাফল্য। কিন্তু জেনারেল সামাদ এই সাফল্যে অসন্তুষ্ট ছিলেন, মূলত ওই মুক্তিযোদ্ধা বনাম রিপ্যাট্রিয়েট মনস্তত্ত্বের কারণেই।
১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ হকিতে বাংলাদেশের সাফল্য পুরো এশিয়ার হকি অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সে সময়ের কথা বলছি— পাকিস্তানকে যদি এশিয়ার হকি শক্তির মাপকাঠি ধরা হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সেদিনের খেলাটি ছিল এক যুগান্তকারী লড়াই। আমরা হেরেছিলাম খেলা শেষ হওয়ার মাত্র তিন মিনিট আগে হাসান সরদারের দেওয়া একমাত্র গোলে। তার আগে টিসা ও মালেক চুন্নু অবধারিত গোল মিস করেছে, আর কিসমত দুবার ওপেন নেটে বল জড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন। খেলা শেষে আমাদের লেফট ইন লুলু আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এটাই প্রমাণ করে সেদিন আমাদের পারফরম্যান্স কতটা দুর্দান্ত ছিল। পাকিস্তানের সৌভাগ্য যে তারা সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল।
মেজর জেনারেল সামাদ, মেজর জেনারেল সাদিক— এঁরা ছিলেন রিপ্যাট্রিয়েট বা পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তা। সে সময় পাকিস্তানে আটকে পড়া অনেক বাঙালি কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সেনাবাহিনীতে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, পরবর্তীতে এই রিপ্যাট্রিয়েটদের অনেকেই জিয়া, মঞ্জুরসহ বহু মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কেন এই গল্প বলছি? কারণ, আমাকে দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়ান গেমসে না পাঠানোর পেছনে লুকিয়ে ছিল সেই মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল মতিনকে কোণঠাসা করে এক পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর আনন্দ।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ হকি দলকে বলা হতো ‘ইমার্জিং টাইগার’। অথচ সেই দল কোরিয়াতে গিয়ে সবার নিচে স্থান পেয়েছিল। আমার বাদ পড়াটা এর অন্যতম একটি কারণ ছিল, কেননা অধিনায়ককে হারিয়ে একটি গোছানো দল মুহূর্তেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। আমাকে আর মেজর জেনারেল মতিন স্যারকে সিলেটে (এসআইএনটি) পাঠিয়ে এরপর পুরো আর্মি দলকে পাকিস্তান ট্যুরে পাঠানো হলো। উদ্দেশ্য একটাই— চাকলাদারকে কেমন খোঁচা দিলাম! সামাদ সাহেব সেদিন খুব জিতেছিলেন। এই ধরনের নোংরা মানসিকতা আমাদের ক্রীড়াঙ্গনকে নিরন্তর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে, যা যুগে যুগে আমাদের পারফরম্যান্সে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এই যে এখন এশিয়ান গেমস চলছে, আমরা আসলে কী অর্জন করব? স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হলো, এখনো ক্রীড়াঙ্গনের ফেডারেশনগুলো তিন বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অথচ এই তিন বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব দেশ রক্ষা করা। তারা মূলত তাদের বাড়তি বা অবসরের সময়টুকুতে ক্রীড়ার দিকে মনোযোগ দেন। অবসর সময়ে ক্রীড়ার দিকে ধ্যান দিলে এবারের এশিয়ান গেমসের মতো হতাশাজনক অবস্থাই হবে। কারণ ক্রীড়াঙ্গনে শতভাগ সময় ও মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প নেই।
বঁড়শিতে যেমন আধার (টোপ) দিয়ে বড় মাছ ধরা হয়, বাংলাদেশের স্পোর্টসও এখন কর্তাদের কাছে সেই টোপে পরিণত হয়েছে। এই টোপ আছে বলেই কর্তারা গেমস দেখার নামে বিদেশে প্রমোদভ্রমণে যেতে পারেন। ক্লাবগুলো নিয়ে গঠিত হয় ফেডারেশন, তার ওপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, আবার তার ওপর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। শেষমেশ প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়। এতসব স্তর পেরিয়ে দল বিদেশে যায়; তারপর পদকের দেখা না মিললেও কর্তাদের দেশ ভ্রমণে কোনো কমতি থাকে না। ছিল না অতীতে।
এই একই চিত্র চলছে তো চলছেই। পুরোনো রিল জায়গায় জায়গায় ধূসর হয়ে গেলেও চিন্তার কিছু নেই, এশিয়ান গেমসের নামে নতুন করে সেই একই রিল আবার সামনে আসছে।
লেখক: সাবেক হকি খেলোয়াড় ও অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় হকি দল
