শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩
মেজর চাকলাদার (অব.) জীবনের গল্প: ৪

জনপদ: ডাইং ডিক্লারেশন ও চরের রক্তক্ষয়ী লড়াই

প্রকাশিত - ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬   ০৯:১২ পিএম
webnews24

আমি সাব-রেজিস্ট্রারের ছেলে, তাই সবাই বেশ স্নেহ করত। যেসব ঘটনা না দেখলেও চলে, সেগুলোও তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখতাম, কেউ মানাও করত না।

বাবা ছিলেন উপশহর এলাকার একমাত্র গেজেটেড অফিসার। নিজের স্বাভাবিক দায়িত্বের বাইরেও বাবার একটি বিশেষ কাজ ছিল— ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ বা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি গ্রহণ করা। মৃত্যু পথযাত্রীর শেষ কথাগুলো গেজেটেড অফিসার হিসেবে বাবাকেই লিপিবদ্ধ করতে হতো। অনেক সময় হাসপাতাল থেকে আহতদের সরাসরি আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তারা আমাদের বাসার নিচের খোলা জায়গায় শুয়ে বা বসে থাকত। বাবা খবর পেলেই দ্রুত নিচে নেমে তাদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করতেন।

একদিন দেখলাম, এমন একজন চাদর পেঁচিয়ে বসে আছে। তাকে ঘিরে বসে আছে আরও আট-দশজন লোক। পাশে দুই-তিনজন পুলিশও দাঁড়িয়ে আছে। এসব দেখার প্রতি আমার দারুণ উৎসাহ ছিল। আমি আহত লোকটিকে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। তিনি একদম ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন, কোনো কথাই বলছেন না। আব্বা নিচে নেমে চেয়ার টেনে বসে বললেন, "চাদরটা সরাও।"

চাদর সরানোর পর দেখলাম, তার বুকের মধ্যে একটি টেঁটা ঢুকে আছে! টেঁটার বাঁশের ডাঁটটা কেটে ফেলা হয়েছে। চরের জমি দখলের লড়াইয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন তিনি। এমন সময় ওই এলাকার চেয়ারম্যান এবং দুই-তিনজন মেম্বার এলেন। চেয়ারম্যানকে দেখেই আহত লোকটি বলে উঠল, "মরুম না চেয়ারম্যান! তয় আমার হাতে তুই শ্যাষ হবি।"

এরপর আব্বার সামনেই দুই পক্ষের লোকজনের কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি চলল। তারপর আহত লোকটি বাবাকে বলল, "হুজুর, এই চেয়ারম্যান নিজেই আমার বুকে টেঁটা ঢুকাইছে।" আব্বা চেয়ারম্যান সাহেবকে ভালোভাবেই চিনতেন। তিনি জবানবন্দি লিখতে লিখতেই চেয়ারম্যানকে বললেন, "আপনি আগাম জামিন নিয়ে নিন।"

বরিশাল এলাকার গৌরনদী, বাকেরগঞ্জ কিংবা নদীর ওপারে ফরিদপুরের চর অঞ্চলে জমি দখল নিয়ে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ লেগেই থাকত। মাসে প্রায় দশ-বারোটা এমন ডাইং ডিক্লারেশন নেওয়ার ঘটনা আমি দেখতাম।

আরেক দিনের ঘটনা। বাবার খুব কাছের এক বন্ধু, যিনি ঠিকাদারি করে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন, তিনি বাবার বন্দুকটা ধার চাইলেন। বাবা বললেন, "আগে নাস্তা খান, তারপর নিয়ে যেয়েন।"

এমন সময় বাবার অফিসের পাঙ্খা-পুলার আফসার মাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, "বুজি, বন্দুক দিয়েন না। ইনি কাইল জমি দখলে যাইবো।" মা ফিরে এসে বাবার বন্ধুকে বললেন, "ভাই, বন্দুক নিয়ে ছেলেরা কাল পাখি শিকারে যাবে, তাই আজ বন্দুক দেওয়া যাবে না।"

বন্দুকের গুলির বিরুদ্ধে চরের মানুষদের আবার দারুণ আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছিল। তারা মোটা ছালা বা বস্তা ভিজিয়ে লম্বা দড়িতে ঝুলিয়ে রাখত। এই ভেজানো ছালার লাইনের পেছনে তারা টেঁটা, জুঁতি, বর্শা, কুড়াল— এসব দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিত। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ভেজানো ছালা ভেদ করে বন্দুকের গুলি আসতে পারে না। সত্যিই আমি বহু মানুষের ডাইং ডিক্লারেশন নেওয়া দেখেছি, কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো— গুলিতে আহত কোনো রোগী আমার কখনো চোখে পড়েনি।

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন
মেজর চাকলাদার (অব.)