মেজর চাকলাদার (অব.)
৫৫ বছর বয়স আমাদের দেশের। ১৯৭৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে প্রথম অংশ নেওয়ার পর থেকে বর্তমানে জাপানে চলমান এশিয়ান গেমস পর্যন্ত প্রতিটিতেই আমরা যোগ দিয়েছি। এবার ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিতে ১৮৭ জন অ্যাথলেট এবং ৬২ জন কর্তাব্যক্তি জাপানে গেছেন। বিদেশের প্রায় প্রতিটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেই আমরা অংশগ্রহণ করি। কিন্তু পুরস্কার অর্জনের জন্য ক্রীড়াবিদদের যে যথাযথভাবে প্রস্তুত ও যোগ্য করে তারপর পাঠানো উচিত— এ কথাটি কর্তাব্যক্তিদের মনে থাকে না। আমরা কি পেয়েছি তা, সবারই জানা। আমরাও চরছি দিশাহীন যাত্রির মতো।
অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন হকি জাতীয় দলের সাথে দিল্লির এশিয়ান গেমসে যাচ্ছি। কলকাতা পর্যন্ত বিমানে, তারপর রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি। জাতীয় হকি দলকে চাইলে একবারে ঢাকা-দিল্লি বিমানে করেই পাঠানো যেত। যাক সে কথা। ট্রেনে ওঠার পর হকার থেকে ম্যাগাজিন কিনে পড়ছি। হঠাৎ খেলার পাতায় একটি ছবি দেখে চোখ আটকে গেল— শর্ট কর্নারের (বর্তমানে পেনাল্টি কর্নার) বল স্টিক দিয়ে কীভাবে থামাতে হয়, তার সচিত্র বর্ণনা। অথচ ঢাকা ছাড়া পর্যন্ত আমরা হাত দিয়েই বল থামিয়েছি! সুতরাং ট্রেনের ভেতরেই জায়গা করে শুরু হলো স্টিক দিয়ে বল থামানোর শেষ প্রচেষ্টা।
আমাদের যোগ্য খেলোয়াড় আছে, আছেন দক্ষ ও অভিজ্ঞ সিনিয়ররা। কিন্তু সেই মান্ধাতার আমল থেকে এত রেষারেষি যে, হকি থেকে শত হস্ত দূরে থাকতে পারলেই যেন সিনিয়ররা বাঁচেন।একবার হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য নির্বাচন হয়েছিল। হকির বরপুত্র আবদুস সাদেক নির্বাচনে দাঁড়ালেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত এক জুয়াড়ি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই জুয়াড়ির কাছে সাদেক ভাই হেরে গেলেন এবং সেই ব্যক্তি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। তিনি হকির ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে দলকে বিদেশে পাঠালেন, অথচ এর আগে কেউ ফিক্সড ডিপোজিটে হাত দেননি। আগে স্পনসর জোগাড় করে সেই টাকায় হকি দল বিদেশে যেত।আমাদের এমন একজন সভাপতি দরকার, যাঁর হকির প্রতি প্রকৃত আগ্রহ ও ভালোবাসা আছে। মনে রাখতে হবে, মাছের পচন ধরে মাথা থেকেই। যিনি হকিতে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন, তাঁকেই সভাপতির আসনে বসানো উচিত। ১৯০৭-০৮ সাল থেকে ঢাকায় হকি খেলা চললেও আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের কোনো দৃষ্টান্ত আমরা স্থাপন করতে পারিনি। এশিয়ান গেমস থেকে ফিরে আসার পর দলের ‘ডি-ব্রিফিং’ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে নিজেদের ত্রুটিগুলো ভুলে যাওয়ার আগেই আলোচনা ও পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। শুধু হকি নয় সব খেলাতেই বাংলাদেশের যেনো পিছিয়ে পরাই গল্প। আর সেই গল্পের শেষ কোথায় আমাদের জানা নেই।
অথচ চীনের কথায় আসি। এই চীনকে নিয়ে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, "ঘুমন্ত চীনকে জাগিও না।" কে শোনে কার কথা, শেষমেশ গুঁতাগুঁতি করে চীনকে জাগিয়েই ছাড়ল সবাই! সেদিন পর্যন্ত চীন ঘুমিয়েই ছিল। মাও সে তুং কুওমিনতাং সরকারকে উৎখাত করে চীনের ক্ষমতা নেন এবং চিয়াং কাইশেককে ফরমোজা (তাইওয়ান) দ্বীপে বিতাড়িত করেন। সেই চীন আজ পদক তালিকার শীর্ষে। জাপান তো অ্যাটম বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়া এক দেশ। প্রতিশোধের আগুনে সময় নষ্ট না করে আজ তারা এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। ভারতের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ পেয়েছে মাত্র ৪টি সোনা! এত লোকবল থাকার পরও তাদের এই হতাশাব্যঞ্জক ফলাফলের কারণ নিয়ে হয়তো অনেক কথা হতে পারে। আর আমরা? আমাদের অবস্থা হলো সেই গানের কথার মতো— আমি এসেছি এসেছি/ নিয়ে এই হাসি রূপ ও গান/ আজি আমার যা কিছু আছে/ এনেছি তোমার তরে/ তোমারে করিতে সব দান।
যেন জাপান থেকে বেবাক দান-খয়রাত করতেই তারা ফিরে আসছে! গানের কলিতে বলা হলো, "আমার যা কিছু আছে..."। কিন্তু আমাদের আছেটা কী ভাই?প্রাপ্তির মধ্যে দেখলাম, আমাদের এক অফিশিয়াল অন্য দেশের পুরস্কার জয়ীদের গলায় মেডেল পরাচ্ছেন! সান্ত্বনা এই যে, অন্তত পুরস্কার মঞ্চের ধারে-কাছে তো যাওয়া গেছে এবং সেটার ছবিও উঠেছে। এবারে আমাদের এখন পর্যন্ত প্রাপ্তি বিশেষভাবে একটি পদক অর্জন। হয়তো আরও কিছু পেলে পেয়েই যেতে পারি।
অবশ্যই একটি অর্জন লাল-সবুজের পতাকা উজ্জ্বল করেছে। এটা দীর্ঘদিন পর। ২০২৬ সালের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে উশুতে বাংলাদেশের হয়ে ঐতিহাসিক পদক জয়ী অ্যাথলেটের নাম জিন্নাত আক্তার। ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যাটা স্মরণীয় করেছেন বাংলাদেশের উশু খেলোয়াড়। তার হাত ধরে ৪০ বছর পর এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক নিশ্চিত হয়েছে। মেয়েদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়ার তিসারা দিয়া ফ্লোরেন্টিনা অতিরিক্ত ওজনের কারণে ডিসকোয়ালিফায়েড হওয়ায় জয় পেয়েছেন জিন্নাত। তাতেই সেমিফাইনালে উঠে অন্তত ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের এই উশু খেলোয়াড়।
এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের সর্বশেষ পদক এসেছিল ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে। বক্সিংয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন মোশাররফ হোসেন। এরপর চার দশক ধরে ব্যক্তিগত ইভেন্টে আর কোনো পদক আসেনি বাংলাদেশের। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর পথে জিন্নাত।
