শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩

এশিয়া কাপ হকি থ্রিলার

প্রকাশিত - ০৩ অক্টোবর, ২০২৬   ০৬:২৯ পিএম
webnews24

মেজর চাকলাদার (অব.) : ভারত-পাকিস্তান হকি ম্যাচ মানেই হকিপ্রেমীদের জন্য ঈদের মতোই আনন্দ। ১ অক্টোবর ২০২৬-এ জাপানের কাকামিগাহারায় অনুষ্ঠিত এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখার মূল কারিগর ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তান বর্তমান বিশ্ব হকিতে ভারতের চেয়ে অনেক যোজন পিছিয়ে থাকা এক পথহারা দলই হয়ে পড়েছিল।

খেলা শুরুর পর ভারত দ্রুত তিন গোলে এগিয়ে গেলে সবাই ভাবছিল পাকিস্তান হয়তো আরও ৭/৮টি গোল হজম করবে। কিন্তু পাকিস্তান হঠাৎ যেন তাদের সুপ্রাচীন হকি ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করল। ৩-০ থেকে ৩-৩ গোলে সমতায় ফিরে তারা বুঝিয়ে দিল—ঘুমন্ত পাকিস্তান হকি অবশেষে আড়মোড়া ভাঙছে। তবে কিছু ভুল কখনো শোধরানো যায় না।

ম্যাচের শেষ মিনিটে ভারতের ফরোয়ার্ড অভিষেক গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটি ক্রস বাড়ান। বলটি পাকিস্তানের ডিফেন্ডার সুফিয়ান খানের স্টিক লেগে দিক পরিবর্তন করে এবং গোলরক্ষক আলীরেজা তা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগেই জালে জড়িয়ে যায়। ফলে ৪-৩ গোলে ম্যাচ জিতে ভারত ফাইনালে পৌঁছে যায়।

গোলটি খাওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ আগেও বল পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময় বলটি স্কুপ বা এরিয়াল করে সহজেই ভারতের সীমানায় পাঠিয়ে দেওয়া যেত। তা না করে ড্রিবলিং করে চমক দেখাতে গিয়ে গোল হজম ও পরাজয়ের খেসারত দিতে হলো তাদের। পাকিস্তান এখন তৃতীয়-চতুর্থ স্থানের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে খেলবে।

পাকিস্তান হয়তো হেরেছে, তবে তাদের জং ধরা হকি স্টিক ঘষেমেঝে তারা যে শক্তিশালী ভারতকে ঘাম ঝরিয়ে ছেড়েছে— এটাই এশিয়ান হকির বড় প্রাপ্তি। উল্লেখ্য, এই টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দল সরাসরি ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ৭-১ গোলে চীনের কাছে হেরেছে। আমাদের খেলোয়াড়েরা বিদেশে গেলেই যেন বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো অবস্থা হয়—‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ।’

কড়ি কড়ি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে কোচ আনা হলেও ফলাফল সেই নিম্নসারিরই রয়ে গেল। বিদেশি কোচ যে ভাষায় কথা বলেন, তা আমাদের হকি খেলোয়াড়দের কাছে অনেকটাই দুর্বোধ্য। ফলে মাঠের খেলায় কিছু শারীরিক দৌড়াদৌড়ি আর ড্রিবলিং ছাড়া নতুন কৌশল আর দেখা যায় না।

আমাদের বিকেএসপি রয়েছে; এখন থেকেই দলকে সেখানে রেখে আগামী টুর্নামেন্টগুলোর পরিকল্পনা করা জরুরি। আমাদের দেশীয় কোচেরা যথেষ্ট ভালো, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সাবেক ও জ্যেষ্ঠ হকি খেলোয়াড়দের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তরুণদের সাথে শেয়ার করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে ইউরোপ বা নিউজিল্যান্ডের মতো পরাশক্তিগুলো মূলত পেনাল্টি কর্নার কাজে লাগিয়েই ম্যাচ জিতছে; ফিল্ড গোল আজকাল খুব কদাচিৎ দেখা যায়। তাই আমাদেরও দ্রুত 'পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট' তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, খেলোয়াড়দের মাসোহারা এমন মানসম্মত করা উচিত, যাতে পরিবার নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

আর একটি বিষয়—বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন জাপান গেলেন এবং কী জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের সেখানে যেতে হলো, তা জনগণের কাছে পরিষ্কার করা দরকার। প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এবার ২৫০ জনেরও বেশি সদস্যের বহর নিয়ে গিয়ে অর্জনটা আসলে কোথায়?

শেষে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। রাজার হাতির পেট ফেঁপেছে। গণক, পুরোহিত থেকে শুরু করে সব ভবিষ্যৎ বক্তা হিসাব-নিকাশে বসেছেন। সিদ্ধান্ত হলো— অমুক দিনের অমুক সময়ে রাজার হাতি ‘ফার্টিং’ (বায়ুত্যাগ) করবে। ফার্টিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময় জানার পর হাতির পেছনের ৩-৪ গ্রামের মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়া হলো। রাজার হাতির ফার্টিং বলে কথা! অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। সবাই আতঙ্কে তটস্থ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজার হাতি বায়ুত্যাগ করল—‘ঠুস!’

আমরাও কোনো গেমসে অংশ নিতে যাওয়ার আগে ‘ইয়ে করেঙ্গা, ও করেঙ্গা’ বলে বিশাল হুঙ্কার দিই, আর দিনশেষে ফলাফল হয় ওই—‘ঠুস!’

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন
মেজর চাকলাদার (অব.)