২৪ঘণ্টা অনলাইন : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আয় রোজগার নিয়ে প্রায়শই নানা কথা শোনা যায়। যে হারে অ্যাকাউন্ট দিনে দিনে বড় হচ্ছে মাঠের ক্রিকেট নিয়ে হতাশাই বেশি হতে হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যে অনেকটা হঠাৎ করে মঙ্গলবার বিসিবিতে অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদিন দুপুর গড়াতেই মিরপুরের হোম অব ক্রিকেট শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ভিন্ন রকমের ব্যস্ততা। সাধারণত দেশের ক্রিকেটের প্রধানতম ভেন্যুতে ক্রিকটে খেলাটাই হয় ব্যস্ততার সবচেয়ে বড় কারণ। কিন্তু এদিনের ব্যস্ততা ছিল মিরপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান নিয়ে। ঠিক দুপুরে বিসিবিতে এসে হাজির হন দুদকের কর্মকর্তারা। প্রায় ১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এই অভিযান। সেখানে কর্মকর্তারা তাদের তদন্ত চালিয়ে গেছেন। কী অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান, তা দুই সহকারী পরিচালক আল আমিন ও মাহমুদুল হাসান পরিষ্কার করেন অভিযান শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে। এ অভিযান মূলত তিনটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চালানো হয়েছে।
অভিযোগ তিনটি হলো, তৃতীয় বিভাগের বাছাইপর্বের ফি ও দলগুলোর অংশগ্রহণকে নিয়ে, সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের অধীনে বিপিএলের টিকিট বিক্রিও ছিল অভিযানের এজেন্ডায়। ছিল মুজিববর্ষের আয়োজনে অর্থ ব্যয় ও অর্থ তছরুপের অভিযোগও। এর আগে সাবেক বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের নামে তদন্তে নেমেছিল দুদক। হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার এবং ক্রিকেট বোর্ডে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল পাপনের বিরুদ্ধে। দুদক জানায়, এই অভিযান শুধুই তাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য। তাদের যাচাই-বাছাই চলবে আগে। তা শেষে তারা প্রতিবেদন দাখিল করবেন কমিশনের কাছে। সেখান থেকে প্রয়োজন হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজনও ছিলেন সে সংবাদ সম্মেলনে। এ অভিযানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে তদন্ত শেষের আগ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে সম্মত হননি। মিরপুরে বিসিবি মঙ্গলবার সকাল থেকে চলছিল গুঞ্জন, দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল অভিযানে আসছে। এ সময় বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ দেশে না থাকলেও সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন তখন অফিসে ছিলেন। দুদক কর্মকর্তাদের আগমনে বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ে একধরনের অস্থিরতা দেখা যায়। প্রথমে গণমাধ্যমকর্মীদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরে সাংবাদিকদের কার্যালয়ে ঢোকার অনুমতি দেন সুজন। দুদকের এই অভিযান পরিচালনা করেছেন দুই সহকারী পরিচালক আল আমিন ও মাহমুদুল হাসান এবং পরিদর্শক খলিলুর রহমান। অনুসন্ধান চলা অবস্থায় এক ব্রিফিংয়ে তাঁরা জানান, বিসিবির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এটা করার জন্য অনেকদিন ধরেই প্রস্তুতি চলছিল।
অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় বিভাগে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অস্বাভাবিক হারে আবেদন বেড়ে যাওয়ায় সন্দেহের উদ্রেক করেছে। সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, ‘পূর্বে যেখানে ২-৩টি দল আবেদন করত, এ বছর ৬০টির বেশি দল আবেদন করে। আগে আবেদন ফি ছিল ৫ লাখ টাকা, এবার তা কমিয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। হঠাৎ করে এত বেশি আবেদন ও আবেদন ফি কমার পেছনে কোনো গোপন লেনদেন বা সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। স্থানীয় ক্লাব ও সংগঠকদের প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও প্রাথমিকভাবে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আমরা এখন বিসিবির জমা দেওয়া নথিপত্র খতিয়ে দেখছি।’ টিকিট বিক্রিতে বিসিবির দেখানো আয় ও বাস্তব আয়েও বড় ধরনের গরমিল রয়েছে বলে দুদকের সন্দেহ। আল আমিন বলেন, ‘বিপিএলের তৃতীয় থেকে দশম আসর পর্যন্ত বিসিবি যে আয় দেখিয়েছে, তা প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অথচ একাদশ আসরে অনলাইন টিকিট বিক্রি করেই বিসিবি আয় করেছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। আগে টিকিট বিক্রির তথ্য হয় গোপন রাখা হয়েছে, অথবা সেখানে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাৎ ঘটেছে।’
দুদক আরও একটি গুরুতর অভিযোগ পেয়েছে মুজিব শতবর্ষ উদ্যাপনকে ঘিরে। যেখানে ১৫ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। অথচ দুদকের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৮ কোটির বেশি অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি। সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, ‘দুদক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নামে না। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে কমিশনের অনুমোদনের পরই আমরা অভিযান চালাই। বিসিবির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। এ অভিযানে আমরা শুধু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। বিসিবি আমাদের সহযোগিতা করছে। সবকিছু কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এরপর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
